#পর্বসংখ্যা২০
#হ্রদয়ামিলন
#Shavakhan
-"Do you miss me wifey?"
সানা হঠাৎ কারো কণ্ঠস্বর শুনে চমকে ঘাড় নেড়ে পাশে ফিরে তাকায়। নজরে আসে আরজে, যে ইতিমধ্যে সানার দিকে মাদকতা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে। সানা কিছু না বলে হাত বাড়িয়ে নিজের প্লেট খানা নিয়ে পাশের চেয়ারে চলে যায়। আরজে কিছুটা ব্যথিত হল সানার নীরবতায়। তারপরও সানার বসা ওই চেয়ারে বসে পরে। সানা চুপচাপ নিজের খাবার খাচ্ছে। সানা চায়ের কাপের জন্য হাত বাড়ানোর আগেই আরজে কাপটা এগিয়ে দিল তার দিকে।সানা নির্বিগ্নে নিজের চা পরোটা একমনে খেয়ে চলছে। অন্যদিকে আরজে পাশে বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। হরিণ টানা চোখের সাথে মেয়েটার উজ্জ্বল শ্যামরাঙ্গা মায়াবী মুখখানা কেমন একদম মিলিয়ে যাচ্ছে। যেন এই রঙটা ছাড়া তাকে মানাতই না। না মেকাপের প্রসাধনী, না অতিরিক্ত সাজগোজ, সব সাধারণ মিলিয়ে যেন একদম পারফেক্ট। কিন্তু পাশে বসা রমণীর কি সেদিকে খেয়াল আছে? না নেই। সে এক মনে নিচের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিমায় খেয়েই চলছে। এবার আরজে লক্ষ করলো সানা একদম রেডি হয়ে আছে। সে ভ্রুকুটি করে জিজ্ঞেস করল,
-"তুমি কি কোথাও যাচ্ছ?"
সানার কণ্ঠস্বর নিরেট ও শান্ত,
-"ভার্সিটিতে"
আরজের কপালের ভাঁজ আরো সংকুচিত হলো,
-"ভার্সিটিতে মানে?"
-"ভার্সিটিতে মানুষ কেন যায়?"
-"তুমি পড়াশোনা শুরু করেছ?"
সানার স্বল্প শব্দের জবাব,
-"হুম"
আরজে ঠোটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে একদম সানার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
-"তুমি চাইলে আমি তোমার বায়োলজির ক্লাস নিতে পারি"
সানার ভাব পরিবর্তন হলো না। সে সামনের থেকে আরেকটা পরোটা নিতে নিতে বলল,
-"আমি আর্টস এর স্টুডেন্ট"
আরজের মনে হলো কেউ তার মুখের উপর এক বালতি জল ফেলে দিয়েছে। সে মুখটাকে বেজার করে বলে ওঠে,
-"ও আচ্ছা... আমি কামালকে বলে দিচ্ছি ও তোমাকে দিয়ে আসবে।"
-"নো থ্যাংকস, আমি ক্যাব বুক করে নিয়েছি"
আরজে কামালকে ফোন দেওয়ার জন্য মাত্র হাতে ফোন নিয়েছে। সানার কণ্ঠস্বর কানে আসতেই নিজের হাতের ফোন খানা চেপে ধরে শক্ত কণ্ঠে শুধালো,
-"সানা ডোন্ট ফোর্স মি, আমি এমন কিছু করি যেটা তোমার পছন্দ হবে না।"
কিন্তু ওই পাশের রমণীর থেকে কোন জবাব আসলো না। সে নিরব নিবৃত্তে উঠে চলে যায়। সানার এড়িয়ে যাওয়া আরজের বুকে ছুরি গাঁথার মতো মনে হলো। সে রাগে টেবিলের সবকিছু হাত বাড়িয়ে ফেলে দিলো। কাচের জিনিসগুলো মুহূর্তে ঝন্ ঝন্ করে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। আরজে দুই আঙ্গুলে নিজের মাথা ঘষে ভাবে,
'মেয়েটা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে আজকাল। কেমন যেন তার থেকে দূরে দূরে থাকছে। কিছুদিন আগেও আরজে রাত করে বাড়ি ফিরলে সানা তার জন্য বসে থাকতো। এটা সেটা জিজ্ঞেস করত? কিন্তু কাল সারারাত সে বাড়িতে ছিল না, অথচ মেয়েটা জিজ্ঞেস তো দূর একটা খোঁজ নিল না। কোথাও সানা অন্য কাউকে.....
না না সে আর ভাবতে পারছে না। যদি এমন কিছু হয় তাহলে আগে ওই ছেলেকে খু*ন করবে। আরজে দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
"তোমার অভিযোগ গুলোই সুন্দর ছিল,
তোমার নীরবতা আমাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
অথচ আমি চাইতাম তুমি এমনই থাকো"
__________________________
এসপির নতুন কালো 'মার্সিডিজ জি–ওয়াগন' জিপে বসে আছে সানা। সে কামালকে আচ্ছা মতন গোল খাইয়ে এসেছে। এসপির নতুন গাড়ি দেখে অনেকটা অবাক হয়েছিল বটে,
-"রোজ নতুন নতুন গাড়ি কোথা থেকে পাস তুই। কোথাও আমাকে না বলে ব্যাংক ডাকাতি করিস নি তো?"
এসপি শার্টের কলার উঁচিয়ে ভাব নিয়ে বলল,
-"ব্রো এর থেকে"
এবার সানা নাক মুখ কুঁচকে কিছুটা ব্যঙ্গ করে বলে ওঠে,
-"একে তো ভাইয়ের টাকা, তার ওপরে তুই ফুটানি দেখাচ্ছিস। সর এখান থেকে, ফকিন্নি কোথাকার।"
এসপি একটি কথাও বাড়ালো না আর। বাড়ালেই তাকে আরো একগাদা অপমান শুনতে হবে।
কিন্তু কিছুক্ষণ থেকেই লক্ষ্য করছে সানা আজকে সবাইকে 'শ' টাকার নোট দান করছে। এসপি কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করে,
-"তোর সাথে এত বড় ফকির বসে থাকতে, তুই অন্য কাউকে দান করছিস। আমাকেও কিছু দে"
সানা তার দিকে তাকিয়ে শটাকার একটা নোট এগিয়ে দেয়। এসপি সেটাকে হাতে ধরতেই সানা বলে ওঠে,
-"নে ধর এগুলো কালনাগিনীর টাকা"
এসপি ঝাড়া মেরে ফেলে দিল,
-"আরে কি বলছিস কি? বিষে ভরা মানিইইই....!"
-"না... না, নেয় না নে আরো নে"
-"আব্বে হ্যান্ডওয়াশ দেয়য়য়য়...."
সানা তার দিকে টিস্যু বক্সটা এগিয়ে দিল,
-"এই নেয় টিস্যু দিয়ে কাজ চালা"
-''নিয়েছিস কিভাবে?"
-"লুটে নিয়েছি"
এসপি একটা সাবাসি দিয়ে উৎসাহ বাড়াতে বলে ওঠে,
-"বাহ দিদি বাহ, একদম বেশি করে নিতি"
সঙ্গে সঙ্গে প্রতুত্তর আসে সানার থেকে,
-"তুই তো জানিস আমি মেয়েটা খারাপ হতে পারি কিন্তু মনটা একদম কাকের মতো সুন্দর, জিলাপির মতো সোজা, পাথরের থেকেও নরম। আমি কি কাউকে বেশি লুটতে পারি বল।"
এবার দুজনেই উচ্চ হাসিতে ফেটে পড়ল। গাড়ি চলতে থাকল তার আপন গতিতে।
_________________________
জাওয়ান ম্যানশনের হলরুমে সামনাসামনি বসে আছে আরজে আর মিসেস সোফিয়া। পুরো কক্ষে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। আরজে একটু আগে এসেছে। সোফিয়ার হাতে অফিসের কাগজপত্র। প্রথম নীরবতা ভেঙ্গে আরজে বলে ওঠে,
-"মম আমি ডিসিশন নিয়ে নিয়েছি, আমি বিয়ের ব্যাপারটা পাবলিক করব।"
সোফিয়া বিদ্যুৎবেগে আরজের দিকে অবাক করা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো,
-"রনো, ব্যাটা ডু ইউ লস্ট ইউর মাইন্ড?"
আরজে মুখ খুলে কিছু বলার আগেই তিনি আবার শীতল কন্ঠে বলেন,
-"তুমি জানো তুমি কোথায় আছো। তুমি কি চাইছো এই মুহূর্তে ওই নির্দোষ মেয়েটার প্রাণ যাক। তুমি কি ওর জীবনের গ্যারান্টি দিতে পারবে?"
ভেসে এলো আরজের কাট কাট শক্ত কণ্ঠস্বর,
-"আই ক্যান প্রোটেক্ট মাই উইমেন"
সোফিয়া ভেতর থেকে আগ্নেয়গিরির মত ফেটে পরলেও উপরে তার স্তর একদম শীতল শান্ত। যেন কিছুই হয়নি। তিনি আরজে কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,
-"লিসেন রনো চারদিকে আমাদের শত্রুর অভাব নেই। আবার নতুন করে মাস্টার পেছনে পড়েছে। গত তিনদিনে ওকে ধরার জন্য আমি অনেক লোক লাগিয়েছি। এই নিয়ে সাত আট জনকে মে*রেও পেলেছে ও। তুমি কি চাইছো ঐ মেয়েটাকে এসবে জড়াতে। তু....."
সোফিয়া নিজের বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই আরজে ঘর কাপিয়ে উন্মাদের মত হেসে উঠলো। সোফিয়া বুঝলো না তার হাসির কারণ। আরজে কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
-"ইউ নো হোয়াট মম, আমি সানাকে এতদিন কেন দূরে রেখেছি। কারণ বহিঃশত্রুর থেকেও আমার ঘরশত্রু অনেক বেশি ডেঞ্জা*রেস"
সোফিয়া এবার আর নিজেকে আটকাতে না পেরে রাগে গর্জে উঠলেন,
-"আরজে..... তুমি লিমিট ক্রস করছো?"
ভদ্রমহিলার কথার তোয়াক্কা না করে আরজে উঠে দাঁড়িয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
-"Don't shout on me, Mom. Just remember, you make me like that, like a monster."
এই বলে আরজে কোনদিকে না তাকিয়ে চলে গেল।এদিকে সোফিয়ার রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে। উনি যে ভয়টা পেয়েছিলেন সেটাই হচ্ছে, ক্রোধে কক্ষের সব জিনিসপত্র একে একে ছুড়ে ফেলে ভাঙচুর শুরু করে দিয়েছেন। যেন নিজের রাগ মেটানোর স্বল্প চেষ্টা। সোফিয়া চিৎকার করে ওঠে,
-''ওই মেয়েটাকে আমি মে*রেই ফেলবো, আমার সাম্রাজ্যে আমি কিছুতেই ধ্বংস সহ্য করবো না।"
হাঁক ছুড়ল মুসাবকে, পাকিস্তান বংশ উদ্ভূত আফগান মুসাব মুহূর্তে হাজির হলো। সোফিয়া তার দিকে তাকিয়ে আদেশ ছুড়লো,
-"ওই মেয়েটাকে পৃথিবী থেকে সরানোর ব্যবস্থা কর"
মুসাব মাথা নিচু করে 'ওকে লেডি' বলে চলে গেল।
মুসাব বের হতেই দেখে আরজের বাম হাত ব্রিটিশ জ্যাক দাঁড়িয়ে। তাকে চোখ দিয়ে আরজের গাড়ির দিকে ইশারা করছে। মুসাব তার ইশারা বোঝে আরজের গাড়ির দিকে চলে যায়।
আরজের রোলস্ রয়েলস্ এ পাঁচ মিনিট নীরবতার পর আরজে মুসাবকে শক্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,
-"আপনার লেডিকে বলে দিবেন সানার থেকে দূরে থাকতে।"
মুসাব নিজের কন্ঠ খাদি নামিয়ে বলে ওঠে,
-"তুমি তোমার মাকে খুব ভালো করেই জানো"
-''এজন্যই তো এতদিন চুপ ছিলাম"
-"তাহলে এখন?"
আরজের দ্বিধাহীন স্বীকারোক্তি,
-"ওকে হারানো সম্ভব না"
-''মায়ের বিরুদ্ধে যাবে?"
আরজে ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলে ওঠে,
-"বিরুদ্ধ জানি না। কিন্তু যুদ্ধ হলে, না আমি হার মানবো, না আমি পিছু হটবো।"
মুসাব নেমে গেল গাড়ি থেকে। মুহূর্তে আরজের গাড়ি তার দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করল। তার ভয় হচ্ছে এই মা ছেলের যুদ্ধে ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই ডেকে আনবে না। কারণ দুজনে একই উন্মাদনায় বিশ্বাসী। মুসাব নিচু কন্ঠে আওড়লো,
-"জানিনা ওই মেয়েটার জীবনে কি আসতে চলছে। একটা হাসিখুশি মেয়ের জীবন কিভাবে কালো ছায়ায় জড়িয়ে গেল।"
___________________
-"ঐ সারফারাদ চৌধুরীর কি হলো?"
আয়ানের এই মুহূর্তে ইচ্ছা করছে গলায় ফাঁ*স লাগাতে, না হয় নিজে কচু গাছে ঝুলে যেতে। ব্যাটা সকাল থেকে এ পর্যন্ত পঞ্চাশ বার বোধহয় জিজ্ঞেস করে ফেলেছে। তারপরও মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
-"স্যার আমি দশ বারো জায়গা থেকে খোঁজ নিয়েছি, ওরা ফ্রেন্ডই শুধু।"
আরজে নিজের চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিল। তারপরও আরজের মনে সন্দেহ যাচ্ছে না। আজকাল সানা একটু বেশিই তাকে এড়িয়ে চলছে। কোথাও ওই ছেলেটার কারণে নয়তো? একবার ওই ছেলের সাথে দেখা করে ভালো করে ক্লাস নিবে সে। অন্যের বউকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে যাওয়া বের হয়ে যাবে। তার ভাবনার সমাপ্তি ঘটে আয়ানের কন্ঠে,
-"স্যার আজ আপনার সারহাদ চৌধুরীর সাথে বিজনেস আর মুভি নিয়ে মিটিং আছে।"
আরজে চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
-"ওকে গিনিতে চলো"
_________________________
সারহাদ নিজের কেবিনের সানা কে ডেকেছে। কিন্তু পাঁচ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন সানা এলোনা তখনই সারহাদ উঠে দাঁড়াল। নিজের হাতে থাকা 'অডেমার পিগে রয়্যাল ওক' ঘড়িতে একবার সময় দেখে নিল। এর মাঝেই তার দরজায় কেউ নক করল। ভেসে এলো রিনরিনে মেয়েলি কণ্ঠস্বর,
-"স্যার আসবো"
সারহাদ চোখ তুলে তাকাল, ঠোঁটে অদ্ভুত ঠান্ডা হাসি,
-"ওহ, সিমরান কাম"
__________________________
আরজে গিনিতে এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। চারদিকে মেয়েদের ভীর লেগে গেছে অলরেডি। তার দুপাশে বিশ্বস্ত দুই যন্তমানব জ্যাক ও কাইলিন, পেছনে আরো তিন চার জন বডিগার্ড। সাথেই রয়েছে আয়ান। আরজে ভীর ছাপিয়ে এগিয়ে যায় ভিআইপি লিফটের দিকে। লিফটে ঢুকে প্রেস করার পর সেকেন্ড ফ্লোরে এসে লিফটের দরজা খুলে যায়। আরজে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই তার চেহারা রাগে লাল হয়ে ওঠে। কেননা সামনে দাঁড়িয়ে সানা আর এসপি। আরজের কণ্ঠস্বর রুক্ষ ও গম্ভীর,
-"So wifey, is it your varsity?"
-চলবে.....
