Ficool

Chapter 23 - Unnamed

#পর্বসংখ্যা২৩

#হ্রদয়ামিলন

#Shavakhan

গিনির পার্কিং লটের ছায়াঘেরা বিশাল স্তম্ভগুলোর মাঝে আরজের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দ, অচল। মাথার ওপর সাদা নীল আলো টিমটিম করে জ্বলছে, আর চারপাশে সুরক্ষিত দেয়ালের ভেতরে একটা ঘন নীরবতা বিরাজ করছে।

গাড়ির ভেতরের বাতাস ভারী, সংকুচিত, দুজনের নিঃশ্বাস পর্যন্ত শুনতে পাওয়া যায়।

আরজে স্টিয়ারিংয়ে দুহাত চেপে ধরে আছে। শিরাগুলো টানটান, বাহু শক্ত, চোখ দুটো পাথরের মতো অন্ধকার।

সানা দূরের একটি সাপোর্ট পিলারের দিকে তাকিয়ে আছে নিরেট, শান্ত, কিন্তু তার চোখে এক ধরনের অচঞ্চল দৃঢ়তা।

আরজে ধীরে, কিন্তু ক্রুদ্ধ স্বরে বলে,

-"তুমি যদি ডিজাইনার হতেই চাও তাহলে 'জেবিতে' চলে আসো। আমি তোমাকে হেড ডিজাইনার বানিয়ে দেব।"

-"আমার কারো দয়া লাগবে না।"

আরজে হঠাৎ ঝট করে তার দিকে তাকায় চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, ভিতরে দহনের ছাই জমে।

"লিসেন ওয়াইফি...?"

আরজে নিজের বাক্য সম্পন্ন করার আগেই সানা তাকে থামিয়ে বলে ওঠে,

-"আপনি কি এসব আলতু ফালতু কথা বলতে আমাকে ডেকেছেন"

আরজে ধীরে ধীরে সামনে ঝুকে সানার দিকে তাকায়। কণ্ঠ নিচু, ক্ষীণ, কিন্তু ধারালো,

-"তোমার এসব ফালতু ফালতু মনে হচ্ছে.... ওই ভাইরাসটা সারাক্ষণ তোমার আশেপাশে কেন থাকবে?...."

সানা আরজের দিকে বিরক্তি সূচক দৃষ্টি ফেলে নিঃশব্দে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। কালকের আগেই তাকে ডিজাইন কমপ্লিট করতে হবে।

সানার পায়ের ধ্বনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। তার সিলুয়েট অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মাত্রই। গাড়ির ভেতরের বাতাস হঠাৎ যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে।

আরজে কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকে।

পাথরের মতো জমে থাকা, নিস্তব্ধ, অনড়।

না সে বলতে পারছে, আর না সহ্য করতে পারছে। তার চোয়াল কেঁপে ওঠে প্রথমে।

তারপর আঙুলগুলো স্টিয়ারিংয়ের ওপর ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়, এতটাই শক্ত যে শিরাগুলো গাঢ় নীল হয়ে ওঠে।

একদম নরম, ফাটল ধরা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে,

"ফা*কিং টক্সিক মাইন্ড, আই হেইট ইউ"

পরের মুহূর্তেই রাগ, আকুলতা, দহন সব মিলেমিশে তার দেহে বিস্ফো*রণের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

সে স্টিয়ারিংয়ে মুঠি মারে,একবার,দুইবার,

তিনবার। অন্ধকার গাড়ির ভেতর শব্দটা পাথরের ওপর লোহার আঘাতের মতো প্রতিধ্বনিত হয়।

তার কপালের শিরা ফুলে ওঠে, নিশ্বাস অস্থির হয়ে ওঠে। চোখের নিচে একটা অদ্ভুত ছায়া নেমে আসে। রাগের নয়, হারানোর গভীর ভয় থেকে জন্ম নেওয়া ছায়া।

সে ছিটকে সিটে হেলান দেয়, দুটো হাত মুখে চেপে ধরে,আর নিঃশ্বাসগুলো ভেঙে পড়া ভবনের ধুলোয় ঢেকে যাওয়া মানুষের মতো, ভারী হয়ে বের হয়। আরজে দুহাত হাঁটুর ওপর রেখে মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার কণ্ঠে ফিসফিসানি,

"তুমি জানো না, সানা, আমার ভেতরে ঠিক কী চলছে, আর না আমি বুঝতে পারছি"

হঠাৎ আরজের চিরচেনা রূপ পরিবর্তন হয়ে গেল। ক্রোধে, দহনে মস্তিষ্ক ফেটে পড়ার অনুক্রম হয়ে এলো। এখন তার ভিতরের জানোয়ারটা বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আরজে নিজের চুল খামছে ধরে দুই হাতে। নিজেকে শান্ত করার যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালানোর পর সে আটকাতে পারছে না। এবার তার ওটা দরকার, না হয় যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। সে তাড়াতাড়ি গাড়ির সিক্রেট বক্স খুলে, একটা ইনজেকশন নিয়ে নিজের কাঁপাকাঁপা হাতে পুশ করে দেয়। ধীরে ধীরে বড় বড় শ্বাস ফেলে সিটে হেলান দিয়ে বসে পড়ে।

জ্যাকের কন্ঠে আরজে চোখ মেলে তাকায়,

-"বস, ওই মাস্টার লেডির গাড়িতে বোম রেখেছে"

-"হুয়াট, মম কোথায়?"

তার কন্ঠে চিন্তার চাপ।

-"লেডি ঠিক আছে"

আরজের চোখ মুখ মুহুর্তে শক্ত হয়ে এলো,

-"ওই মাস্টারকে খুঁজে বের করো"

জ্যাক 'ওকে বস' বলে চলে যায়।

আয়ান এসে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগেই আরজে লক্ষ্য করল, এসপি তাড়াহুড়ো করে গাড়ি নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। মুহূর্তে আরজের শান্ত মস্তিষ্কে আবার প্রতিহিংসার আ*গুন জ্বলে উঠলো। তার ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে এই ছেলেকে গাড়ি চাপা দিতে। পরমুহূর্তে মাথায় এলো এটা করলে সানার চোখে আরো নিচে নেমে যাবে। তাই এক বালতি জল ঢেলে নিজের ইচ্ছাকে ধামাচাপা দেয়। আয়নের দিকে তাকিয়ে শক্ত কণ্ঠে আদেশ ছুঁড়ে,

-"আয়ান ওই ভাইরাসটাকে ফলো করো"

আয়ান বুঝলো না, সে সরল মনে বলে ওঠে,

-"স্যার ভাইরাস তো খালি চোখে দেখা যায় না। তাহলে ফলো..."

তার কথা বন্ধ হয়ে যায় আরজের কটমট দৃষ্টি দেখে,

-''আমার জীবনের ভাইরাস সব জায়গায়তেই দেখা যায়। সামনে দেখো.."

আয়ান একটা শুকনো ঢোক গিলে সামনে তাকায়,

-"স্যার এটা তো ইঁচড়েপাকা ছেলে"

-"এটা আমার পাকা সংসারে মই দেওয়া ভাইরাস"

-"স্যার, ডোন্ট ওয়ারি। এ চোখের আড়াল হলেও আমি ফলো করবো। "

আরজে তার দিকে কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই আয়ান নিজের বোকামি উপলব্ধি করতেই জিভ কেটে তড়িঘড়ি করে বলে ওঠে,

-"মানে স্যার একে আমি চোখের আড়াল হতেই দিব না। আপনার জীবন থেকে এর সানডে মানডে ক্লোজ করবোই। আলহামদুলিল্লাহ মানে ইনশাআল্লাহ।"

আয়ান চলে যায় এসপির পিছনে। আরজে কাইলিনকে এখানে রেখে যায় যাতে সে সানাকে নিয়ে বাড়ি যায়। সে বেরিয়ে পড়ে জাওয়ান ম্যানশনের উদ্দেশ্য।

________________________

গুলশানের বিখ্যাত 'সিক্স সিজন হোটেলে' থাকা 'সিক্স অন নাইনটি সিক্স' ক্যাফেতে বসে আছে এসপি। টেবিলে সাজিয়ে রাখা ক্যাপুচিনো ও কাপকেক। অদূরে আয়ান বসে, মুখের সামনে ধরে রেখেছে মেনুকার্ড কিন্তু সম্পূর্ণ নজর বন্দি এসপিতে। কিন্তু সে গত দুই ঘণ্টায় যা দেখল তাতে তার ছোঁয়াল ঝুলে যাবার অবস্থা। এই নিয়ে পাঁচটা মেয়ে এসেছে এসপির সাথে দেখা করতে বিশ পঁচিশ মিনিট অন্তর অন্তর। আয়ানের মুখ দিয়ে অবচেতন মনে একটা কথাই বের হলো,

''ভেবেছিলাম ইঁচড়েপাকা বেরুলো প্রেমকুমার বাহাদুর''

তার ভাবনার মাঝে কেউ তার পাশের সিটে ধপ করে বসে পড়ে। আয়ান চোখ তুলে এসপিকে দেখেই চমকে ওঠে। এসপি এগিয়ে আসে তার দিকে,

-"ওই জাওরা আপনাকে আমার পিছনে লাগিয়েছে, তাই না"

আয়ান নিজেকে স্বাভাবিক করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে,

-"আমি এখানে কফি খেতে এসেছি"

-"আচ্ছা তাই নাকি। আহারে, গত দুই ঘন্টা ধরে এক কাপ কফি এখনো শেষ হয়নি?এইসব ছাড়েন মেয়ে পটাতে পারেন কি না বলেন?"

আয়ান নাক মুখ কুঁচকে পেলে,

-"আমি সাধু পুরুষ"

এসপি 'চ' বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করে বলে,

-"রাখেন আপনার সাধুগিরি, আসুন আপনাকে অসাধু পুরুষ বানাই। আপনাকে দেখাবো কিভাবে মেয়ে পটাতে হয়।"

আয়ান কিছু বলার আগেই এসপি একজন লেডি ওয়েটারকে ডাকে,

-''এক্সকিউজ মি, মিস,....."

মেয়েটি তার দিকে এগিয়ে আসে,

-"ইয়েস স্যার কিছু লাগবে"

-"ওয়ান কাপ কফি, আর হ্যাঁ,, চিনি ছাড়া প্লিজ"

মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

-"কেন"

এসপির ঠোঁটে দুষ্ট হাসি, হালকা চোখ টিপ মেরে, নাটকীয়ভাবে বলে ওঠে,

-"চারিদিকে এত সুন্দরী রমণীদের মিষ্টি হাসি, তার উপরে যদি কফি ও মিষ্টি হয় তাহলে তো পাক্কা ডায়াবেটিস হয়ে যাবে।"

সামনের রমণী সাবলীল ভঙ্গিতে লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল। পুরো চেহারা জুড়ে মুচকি হাসির চাপ। কিন্তু এগুলো হজম হলো না পাশে বসা আয়ানের। মাত্র কফিতে চুমুক দিয়েছিল, এসপির কথা শ্রবণ হতেই কফি ছিটকে পড়ে সামনে। অলরেডি তার জোরে জোরে কাশি উঠে গেছে। এসপি তার দিকে বিরক্তি সূচক দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত করে। রমনীর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,

-''দেখেছেন, আপনার হাসিতে ওনার সাংঘাতিক সান্ডে মান্ডে ডায়াবেটিস হয়ে গেছে।"

মেয়েটি নিজের লাজরাঙ্গা মুখ নিয়ে কফি আনতে চলে যায়। এদিকে এসপির মনে চলছে অন্য কথা,

'আজকে এই সানডে মানডের পকেটে লাল বাতি জ্বালাতে হবে, আরেকদিন আমার পেছনে লাগার আগে এর সানডে মানডে ক্লোজ হয়ে যাবে'

যেই ভাবা সেই কাজ

-"আচ্ছা মিস্টার সানডে মানডে আমি ভাবছি আপনার এত লজ্জা আপনি বাসর করবেন কিভাবে?"

-"তোমাকে আমার বাসর নিয়ে ভাবতে হবে না''

-"না মানে আমি মানুষের দুঃখে সুখ মানে দুক্কু পাই তো তাই বললাম। সমস্যা নাই, আমি আপনার বিয়েতে চার বোতল কলিকাতা হারবাল গিফট করব।"

রেগে গেল আয়ান, এত বড় অপমান,

-"এই রোমিও মার্কা ছেলে, তুমি এই মুহূর্তে এখান থেকে যাবে।"

এসপি আচ্ছা বলে চলে যায়, কিন্তু ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসির ঝিলিক। কয়েক মিনিট পর ওয়েটার বিল নিয়ে আসে। কিন্তু বিলের কাগজ দেখেই আয়ানের চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। সে তাড়াতাড়ি নিজের কফির কাপ দেখল, না এটা তো কফি তাহলে,

-"স্যার কিছু হয়েছে"

-"আপনারা কফির সাথে কি স্বর্ণের পানি মিশিয়েছেন"

ছেলেটা এমন প্রশ্নে হতবিহ্বল হয়ে গেল

-"না, স্যার কেন?"

গর্জে উঠলো আয়ান

-"তাহলে এক কাপ কফির দাম ষোল হাজার কিভাবে হয়?"

এবার বুঝতে পারলো ওয়েটার,

-"স্যার আপনার কোথাও ভুল হয়েছে, আপনার সাথে থাকা ছেলেটা আপনার নামে বিল দিয়ে গিয়েছে।"

লাফিয়ে উঠলো আয়ান

-"কিহহহহহহ...."

-"জি স্যার....."

এই নিয়ে তাদের মধ্যে ২০ মিনিট তর্কাতর্কি হলো। শেষমেশ ওয়েটার সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সে টাকা না দিলে তাকে বেঁধে পেটানো হবে। বেচারা আয়ান বাধ্য হয়ে দিয়ে দিল। মনে মনে হাজার খানেক গা*লি দিল এসপিকে,

-"শা*লা না আমি মেয়ে পটালাম, না আমি ডেট করলাম, শুধু বসে বসে দেখলাম। তাতেই এই রোমিও আমার পকেটের সানডে মানডে ক্লোজ করে দিয়েছে।"

______________________

স্লিম টেবিল ল্যাম্পের নিচে সানা বসে। নিজের জগতে ডুবে থাকা এক শিল্পীর মতো। তার সামনে ছড়িয়ে আছে কাপড়ের স্যাম্পল, রঙিন পেন্সিল, ডিজাইনের খসড়া। চুলগুলো এলোমেলোভাবে গুঁজে রাখা, হাতার ভাঁজ তুলে রাখা। কলমের শেষ প্রান্ত দাঁত দিয়ে চেপে ধরে সে তীক্ষ্ণ মনোযোগে রেখা টানছিল কাপড়ের স্কেচে। ঠিক তখনই নিস্তব্ধতার ভেতর একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ তার দিকে তাকিয়ে।

সারহাদ নিঃশব্দে দরজায় দাঁড়ায়। তার চোখ অন্ধকারের ভেতর আরও গভীর, আরও স্থির হয়ে ওঠে সানাকে দেখলে। সারহাদ দরজা ঠেলে ঢুকল না, সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল, সানার দিকে তাকিয়ে।

তার দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুদ কিছু। ধীরে ধীরে কাচের দরজা ঠেলে প্রবেশ করে সে।

পিছন থেকে ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘ ছায়া সানার শরীরের ওপর উঠে আসে। এমন ছায়া, যেটা মানুষ না, জন্তুর মতো স্থির, শিকারির মতো নীরব।

কিন্তু কোনো শব্দ নেই, কোনো নিঃশ্বাসের চাপ নেই, শুধু একটা ঠান্ডা উপস্থিতি।

সানা কিছুতেই টের পেল না, সে এতটা মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল।

তবু হঠাৎ তার নাকে আসে 'ব্ল্যাক ফ্যান্টম' এর ঘ্রাণ। সানা আঁকা থামিয়ে উঠে তাকাতেই,

সারহাদ সামান্য মাথা কাত করে তাকায়, সেই শীতল হাসিটা হালকা করে টেনে তোলে।

হাসিটা স্বভাবিক নয়, বরং এমন হাসি, যেটা দেখে মনে হয় সে যেন সানার প্রতিটা ভয়ার্ত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে ব্যস্ত।

সানা সারহাদ কে এখানে দেখে চমকে উঠে।

পরমুহূর্তেই ভ্রু তুলল, একটু বিরক্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"আপনি এইখানে, কিছু বলবেন?"

সারহাদ হালকা হাসল।

-"একজন শিল্পী যখন নিজের কাজে হারিয়ে যায়, তাকে দেখার মতো সৌভাগ্য খুব কম মানুষের হয়। আর আমি মনে হয় তাদের একজন। বাই দা ওয়ে, কালকের মিটিং তোমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ"

-"আই নো"

সানার দৃষ্টি সারহাদের হাতের দিকে পড়ে, সম্পূর্ণ হাতে লাল রং লেগে আছে।পাশেই তার ডিজাইন করা সাদা ড্রেস,

-"স্যার, আপনার হাতে রং লেগে আছে, ওটা কপড়ে লেগে যাবে"

সারহাদ নিজের হাতটা সামনে নিয়ে দেখল,

-"লাল মানে কি শুধু রঙ, র*ক্ত ও তো হতে পারে"

সানা ভ্রুকুটি করে তাকায়, সারহাদ এবার উচ্চশব্দে হেসে বলে,

-"ডোন্ট ওয়ারি, এটা রঙ"

সানা আবার তার কাজে মন দিল। তাকে এগুলো আজকের মধ্যেই শেষ করতে হবে।

সারহাদ কিছু না বলে সানার টেবিলের একধারে রাখা পানির বোতলটা নিয়ে নিঃশব্দে বেড়িয়ে পড়ে।

সারহাদ আবার পেছন ফিরে তাকায়, বিড়বিড় করে আওড়ায়,

-''সবাই ভাবে তারা নিয়ন্ত্রণে আছে।

কিন্তু তুমি… তুমি এত শক্ত যে তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেই আমি আরও গভীর অন্ধকারে নেমে যাই।"

সানার কাজ শেষে নিচে আসতেই দেখে কাইলিন গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে। সে কোন কথা না বলে গাড়িতে উঠে চলে যায়।

_______________________

রাত সাতটার দিকে আরজের কালো বিএমডব্লিউ টা প্রবেশ করে 'মুনলাইট' বিল্ডিংয়ে। আরজে কোন দিকে না তাকিয়ে চলে যায় তার ব্ল্যাক স্পেসের দিকে।

ফ্ল্যাটে এসেই সে নিজের রুমে চলে যায়। তার সারা শরীর জুড়ে র*ক্ত, চোখে মুখে হিংস্র*তার তীক্ষ্ণ চাপ। নিজের রুমে আসার সাথে সাথে হাতের 'ফামারসিনি' ব*ন্দুক টা কাবাটে রেখে ওয়াশরুমে চলে যায়। শাওয়ারের ঠান্ডা পানির স্রোতের সাথে র*ক্ত ধুয়ে চলে যায় শুধু থাকে তার ঠোঁটের বিকৃত হাসির রেখা। ঘন্টাখানেক শাওয়ার নিয়ে বেরোতেই আয়ানের ফোন আসে। আরজে ফোন খানা কানে তুলতেই তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসে। নিজের গায়ে পোশাক জড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যায় সানার রুমের দিকে।

________________________

সানা একবার চোখ তুলে আরজের দিকে তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিল।

-"তুমি কি জানো তোমার ওই ফ্রেন্ড কি রকম?"

-"কিরকম"

আরজে দন্ত পাটি পিষে বলে,

-"এক নাম্বারের 'বারোভাতারি।''

-"আপনি নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে ওর পেছনে পড়ে আছেন কেন?"

আরজে গুরুত্ব দিল না তার কথা,

-''তোমার ওই বারোভাতারি ফ্রেন্ড দুই ঘন্টায় পাঁচটা গার্লফ্রেন্ডর সাথে দেখা করেছে"

সানার চোখ কপালে,

-"কি বলছেন কি!!!"

আরজে মনে মনে খুশি হলো, তার মানে সানা জানে নাহ, সে দাম্ভিক স্বরে বলে ওঠে,

-"বিশ্বাস হয়নি তো? আমি তো আগেই বলেছি এসব ছেলে একদম ভালো না"

-"আরে রাখেন আপনার ভালো ছেলে। আমি ভাবছি এতটা অবনতি কিভাবে হলো ওর?"

-''অবনতি!!!"

সানা হায় হুতাশ করে বলে,

-"অবনতিই তো, আগে মিনিটেই পাঁচটাকে পটিয়ে ফেলত, আর এখন দুই ঘন্টায়!!!!! আহারে,,,ছেলেটা দিন দিন ভালো হয়ে যাচ্ছে।"

আরজের চোখ বেড়িয়ে আসার উপক্রম,

-"ভালো হয়ে যাচ্ছে মানে,

এবার আরজে শক্ত কণ্ঠে শুধালো,

"ওর মত বারোভাতারির সাথে তোমার কোন বন্ধুত্ব থাকবে না।এক সেকেন্ড🤔 কোথাও তুমি এমন ছিলে না তো"

সানার মাথায় মুহূর্তে দুষ্ট বুদ্ধি এলো একটু নাচানো যাক একে, চোখে মুখে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,

-"আরে বাহ আপনি কীভাবে বুঝলেন?"

আরজের শান্ত মস্তিষ্কটা মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে,

-"আর ইউ সিরিয়াস?"

-"একদম, ইউ নো হোয়াট কলেজে থাকতে ও ছেলে পটাতো আমি মেয়ে পটাতাম, ধুর আই মিন ও মেয়ে পটাতে আর আমি ছেলে পটাতাম"

আরজে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠে,

-"তোমার এক্স বয়ফ্রেন্ড ছিল কয়টা?"

-"কেন?''

-"যাতে আমি ওদের খু*ন করতে পারি"

সানা কিছু মুহূর্ত চুপ করে থাকলো আরজে মনে মনে একটু খুশি হলো। 'যাক সানা এমন মেয়ে নয়'। একটু পর সানা কে ভাবতে দেখে বলে ওঠে,

-"আমি জানতাম তুমি এমন কখনোই হবে না"

সানার ভাবনার মধ্যে ডিস্টার্ব হতেই সে আরজের দিকে বিরক্তি সূচক দৃষ্টিতে তাকায়,

-"কি করছেন কি? আপনার জন্য আমার গুনতে ভুল হয়ে গিয়েছে?"

-"গুনতে ভুল হয়ে গেছে!!! মানে?? স... সত্যি কি তোমার বয়ফ্রেন্ড ছিল?"

-"দেখুন এখন তো সবগুলো মনে পড়ছে না। জাস্ট ১২০ টা মনে পড়েছে"

আরজের চোখ কপালে, হাতের শিরা টানটান, কণ্ঠে বিস্ময়,

-"এ..এক শত বিশ!!!!!

-"হ্যাঁ... বাট আমি সবার প্রতি ক্রাশ খাইনি শুধুমাত্র পঞ্চাশ জনের উপরেই ক্রাশ খেয়ে ছিলাম"

আরজে নিজের চোখমুখ শক্ত করে সানার দিকে এগিয়ে যায়,

-"আচ্ছা তাই নাকি ৫০ জন ক্রাশ"

সানা একটু পিছনে গিয়ে বলে,

-"দেখুন ক্রাশ মানে সিরিয়াস নয়, আমি সিরিয়াস ছিলাম মাত্র ত্রিশ জনের প্রতি"

আরজের থেমে যাওয়া পা আবার চলতে শুরু করল। সানা আরএকটু পিছিয়ে গেল,

-"আরে আমি ৩০ জনের প্রতি সিরিয়াস থাকলেও মন থেকে মাত্র দশ জন কেই বিয়ে করতে চেয়েছিলাম।"

আরজে এবার আর নিজেকে আটকাতে পারে না। সে একটানে সানার গ্রীবাদেশ টান দিয়ে নিজের মুখের সামনে নিয়ে আসে। সানা একটা শুকনো ঢোক গিলে বলতে শুরু করে,

-"দেখুন দশজন কে বিয়ে করতে চাইলেও, বিয়ে তো তার সাথেই হয়েছে যাকে আমি বিয়ে করতেই চাইনি"

___________________________

এসপি মাত্র কালকে সানাদের 'মুনলাইট' বিল্ডিং এ উঠেছে ছয়তলায়। আজ সকালে সে অফিসে যাওয়ার জন্য লিফটে উঠতেই মুখোমুখি হয় আরজের সাথে। আরজে তাকে দেখেই চোখ মুখ শক্ত করে নেয়, কন্ঠে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে ওঠে,

-"তুমি বারোভাতারি এখন কি আমাদের পিছন পিছন এখানে এসেছো?"

-"দেখুন মিষ্টার জাওরা, এটা আমারও বাড়ি"

-"এ...এ...তুমি জাওরা কাকে বললে"

আরজে কিছু বলার আগেই এসপি লিফটের বাইরে চলে যায়,আরজে ও আসে। এসপি পার্কিং লটে আসতেই দেখে সানা নিজের লিপস্টিক ঠিক করছে গাড়ির আয়নায়,

-"পেস্ট্রি দেখ তোর জামাই আমাকে বারোভাতারি বলেছে"

পিছন থেকে আরজে গর্জে উঠে,

-"তোমার এই বারোভাতারি ফ্রেন্ড আমাকে জাওরা বলেছে"

তাদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া শুরু হয়ে যায়। সানা তাদের দিকে একবার তাকিয়ে বলে ওঠে,

-"আরে বাহ..... লাইভ টম এন্ড জেরি"

-চলবে...

More Chapters