Ficool

Chapter 22 - Unnamed

#পর্বসংখ্যা২২

‎#হ্রদয়ামিলন

‎#Shavakhan

‎জেবি প্রোডাকশন হাউসের সামনে বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে কমে আসছে। চারপাশে ব্যস্ততার কোলাহল ক্যামেরা ট্রাক, ক্রুদের হাঁটা চলার শব্দ, নিয়ন সাইনবোর্ডের আলো টিমটিম করে জ্বলছে। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেই রাজকীয় চিত্তে হেঁটে আসছেন সোফিয়া জাওয়ান।

‎সোফিয়া এসে থামল মেইন গেটের সামনে। ‎তার পোশাক নিখুঁত, চোখে কালো সানগ্লাস, ঠোঁটে সেই অহংকারী শান্তি। যা দেখে সাধারণ মানুষ মনে করে তিনি পরহিতৈষী। কিন্তু যারা তাকে চেনে, তারা জানে এই মুখোশের নিচে আছে এক ভয়ংকর কঠিন ইস্পাত হৃদয় নারী, তার অতীতের মতোই। ‎তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আফগান মুসাব আবেগহীন শূন্য মুখে।

‎‎দু'জনই হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালেন সোফিয়ার কালো গাড়ির কাছে 'ডার্ক-টিন্টেড আর্মারড SUV,'

‎‎সোফিয়া গাড়ির দরজার হ্যান্ডেলে আঙুল রাখতেই… ‎হঠাৎ ‎মুসাবের চোখে এক ঝলক শঙ্কা দেখা দিল। ‎সে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,

‎‎-"লেডি…মনে হচ্ছে কিছু ঠিক নেই। গাড়ি থেকে অদ্ভুত ইএম সিগন্যাল পাচ্ছি।"

‎সোফিয়ার চোখ সরু হল। ঘাড় নাড়িয়ে মুসাব কে কিছু একটা ইশারা করল।

‎‎মুসাব পকেট থেকে স্ক্যানার বের করে হ্যান্ডেলের নিচে লাগাতেই ডিভাইসটি টিক… টিক… টিক… করে দ্রুত অ্যালার্ম দিতে শুরু করল, ‎সেই ছোট শব্দটি যেন মুহূর্তে পৃথিবীর সব আওয়াজকে চেপে ধরল।

‎ -"লেডি, এটা বো*ম।"

‎মুসাবের কণ্ঠ ঠান্ডা, কিন্তু টানটান।

‎‎সোফিয়ার দৃষ্টি কঠিন হয়ে গেল। কয়েক কদম পিছিয়ে এলো। ‎তার মনে হঠাৎই একটি নাম জ্বলে উঠল,

‎"মাস্টার।"

‎‎সেই মুহূর্তেই, ‎এক প্রচণ্ড শব্দে চারদিকের আলো কেঁপে উঠল।

‎‎ -"BOOOOM !!!

‎SUVটি আ*গুনে জ্বলে ওঠল, শিখা মুহূর্তে আকাশে উঠে গিয়ে কালো ধোঁয়া তৈরি করল।

‎চারপাশে চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি।

‎আর সোফিয়ার গায়ে আ*গুনের তাপ এসে লাগল, কিন্তু সে নড়ল না। ‎তার চোখ শুধু দেখল, ধোঁয়ার আড়াল থেকে এক ছায়া বেরিয়ে আসছে।

‎‎কালো স্কিন-টাইট জ্যাকেট, মুখে সাদা হ্যালোইন মাস্ক, ‎পায়ে ভারী বুট ‎আর তার সঙ্গে এক দানবীয় কালো বাইক 'কাওয়াসাকি নিনজা এইচ টু আর'

‎‎বাইকের ইঞ্জিন গর্জে উঠল

-"‎ভ্রুূমমমমম…!"

‎আর সেই ছায়াটি 'মাস্টার'

‎সোফিয়ার ঠিক সামনে দিয়ে সোজা চলে গেল, ‎যেন তার চোখের সামনে দাঁড়িয়েই তাকে অপমান করেছে।

‎‎এক সেকেন্ডের জন্য সোফিয়ার চোখে ভয় ছিল, ‎পরের সেকেন্ডে ‎সেই ভয় পরিণত হল আ*গ্নেয় প্রতিশোধে। তার কণ্ঠ ছিল বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু হিং*স্র

‎-"মুসাব...., আমার লোকেদের পাঠাও। একে আমার জীবিত চাই",

‎‎মুসাব ফোন কানে তুলতেই পাঁচটা কালো SUV দরজা ভেঙে বেরিয়ে এল প্রোডাকশন হাউসের গেট থেকে। ‎ইঞ্জিনের আওয়াজে মাটি কেঁপে উঠল, ‎চাকা ঘুরে ধুলো উড়ল। ‎‎তারা মাস্টারের কাওয়াসাকির পিছনে ধাওয়া শুরু করল।

‎মাস্টার যেন ওদের অপেক্ষাই করছিল, মাস্কের আড়ালে তার ঠোঁটে ফুটে ওঠল ক্রুর হাসি। ‎সে রাস্তায় এমনভাবে মোড় নিল, ‎যেন শহরটা তার ব্যক্তিগত খেলার মাঠ। ‎‎একবার সে সেতুর রেলিং বরাবর বাইক চালাল, ‎একবার লাইটপোস্টের ফাঁক দিয়ে ১০০ কিমি স্পিডে ঢুকে গেল, ‎আর একবার তো ফুটপাথের ধারে দাঁড়ানো পানির ট্যাঙ্কের উপর ঠিক এক চাকা তুলে লাফিয়ে চলে গেল।

‎‎SUVগুলো তার পিছনে পিছনে ধরার চেষ্টা করলেও ‎সে প্রতিবারই তাদের ধোঁকা দিয়ে বেরিয়ে যায়। ‎হঠাৎ ‎সে ধোঁয়ার মতোই মিলিয়ে গেল ট্রাফিকের ভিড়ে।

‎‎SUVগুলো হতাশ হয়ে ব্রেক করেই ‎মুসাবকে খবর দিল।

‎-"লেডি… মাস্টার পালিয়ে গেছে।"

‎সোফিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সংবরণ করে। তার চোখে তখন শুধু আ*গুন, হুংকার দিয়ে ওঠল,

‎ -"কেউ আমাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বাঁচে না। তাকে খুঁজে বের করো। শহরটা উল্টে ফেলো, আমি তাকে চাই… জীবিত, এর ক*লিজা আমি নিজ হাতে বের করে দেখব, ওখানে কতটা সাহস জন্মেছে।"

__________________________

‎‎‎লিফটের হালকা কম্পন যেন দমবন্ধ নীরবতার উপর বৃষ্টির মতো পড়ছিল। ‎আরজের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, ‎সানার বুক একটুও নড়ছে না। ‎দু'জনের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ‎অবহেলার ঠান্ডা দেয়াল আর অভিমানের জ্বলন্ত তলোয়ার।

সানা চোখ তুলে তাকাল। ‎চোখের কোণে কোনো কম্পন নেই কিন্তু আছে বিস্ময়,

-"ভাইরাস! আপনি কি এসপির কথা বলছেন?"

আরজে বুঝলো না সানা কার কথা বলেছে,

-"এটা আবার কোথা থেকে আসলো"

-"এসপি মানে সার..."

সানা বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই আরজে তড়িঘড়ি করে বলে ওঠে,

-"হ্যাঁ ওই ইডিয়েট টাই, এখন তুমি আমাকে সব বলবে, এ টু জেট?"

সানার ভাবলেশহীন জবাব,

-'ও আমার ফ্রেন্ড প্লাস এসিস্ট্যান্ট। এন্ড দ্যাটস্ মাই ওয়ার্ক প্লেস"

আরজের কপালের ভাঁজ প্রসারিত হলো, কন্ঠে রাগের পরিবর্তে প্রকাশ পায় বিস্ময়,

-"ওয়ার্ক প্লেস!!! তুমি এখানে জব করো!!!!"

-"হুম"

ব্যাস এক মুহূর্ত, সামনের রমণীর এমন হেঁয়ালিপনা দেখে আরজে আবার নিজ সত্তায় ফিরে এলো। দন্ত পাঁটি পিষে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,

-"রানভীর জাওয়ানের স্ত্রী অন্যের কোম্পানিতে জব করবে, তুমি এটা ভাবলে কিভাবে?"

সানা জবাব দিল না।‎ তার জবাব না দেওয়া টাই যেন সবচেয়ে বড় অসহ্যকর মনে হলো আরজের কাছে । আরজের শিরা ফুলে উঠল রাগে। ‎সে আবার সামনে এগিয়ে এলো, ‎দৃষ্টি সানার চোখে গেঁথে দিল, গর্জে ওঠল সে,

-"সে সামথিং ইডিয়েট...."

‎সানা এবার ধীরে তাকাল তার দিকে।‎চোখে না অশ্রু, ‎না অভিযোগ। ‎শুধু এক অদ্ভুত, দীর্ঘশ্বাসে ভরা। আরজে বাক্য সম্পন্ন করার আগেই ভেসে এলো বিপরীত পক্ষের নিরেট কণ্ঠস্বর,

-"ভালোবেসেছেন কখনো কাউকে?"

আরজে হঠাৎ এমন প্রশ্নে কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। কয়েক পলকের মধ্যেই হাতের বাঁধন অনেকটা শিথিল হয়ে আসে। এ প্রশ্নের উত্তরে তার শব্দগুলো কেমন আটকে আসছে গলায়।

সানা কয়েকদিন থেকেই লক্ষ করছে আরজের পরিবর্তন। সে নিজের হাত ছুটিয়ে আরজের চোখে চোখ রেখে আবারও প্রশ্ন ছুড়ল,

-"কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করেছেন?"

‎আরজের ভেতরের আ*গুন হঠাৎ নিভে গিয়ে

‎ঘন ধোঁয়ায় রূপ নিল। ‎কথা আটকে গেল।

‎গলা ভারী হয়ে এল। সানা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে আরজের বুকের বাম পাশে মৃদ্যু ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠে,

-"যেই দিন এই হৃদয়টা সত্যিকার অর্থে কারো জন্য স্পন্দিত হবে, ঐদিন আপনি বুঝবেন পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় হচ্ছে অপেক্ষা, যেখানে এক সেকেন্ডও এক যুগ মনে হয়। আরে আপনি তো আমার দুই সেকেন্ডের নীরবতাই মেনে নিতে পারেননি আর দূরে থাক এক বছর। তখন আপনি বুঝবেন কারো সূক্ষ্ম অবহেলাটা আপনার হৃদয়কে কিভাবে বিষন্ন করে তোলে।

আপনার সমস্যা কি জানেন? আমার যত্ন আর অপেক্ষার প্রতি আপনার একটা মোহ জন্মেছে, তাও ক্ষনিকের। তা কেটে গেলেই আবার আগের জীবনে ফিরে যাবেন"

-"যদি তা ক্ষণিকের না হয়?"

আরজের শীতল কন্ঠ ভেসে আসতেই থেমে যায় রমণী। পরপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলে ওঠে,

-"আমি আর নিজেকে ভাঙতে চাই না। সবাই মানুষের বাহ্যিক খোলসের সাজানো মুখোশ দেখতেই ব্যস্ত, কিন্তু সেই মুখোশের আড়ালে ভেতরের বিক্ষিপ্ততার অগণিত ছাই, আর্তনাদ দেখতে সবাই নারাজ, মিস্টার জাওয়ান"

লিফটের ‎দরজা খুলে গেল, সানা আরজের দিকে না তাকিয়েই চলে গেল বাহিরে।

‎‎লিফটের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল,

‎কিন্তু আরজের ভিতরের দরজা যেন আর একটুও নড়ল না।

‎করিডরের আলো তার মুখে পড়ে দেখালো

‎রাগের পরতে পরতে জমে থাকা ভাঙচুর,

‎আর ভেতরের এক বিপজ্জনক শূন্যতা।

‎‎সে থমকে দাঁড়াল। ‎পায়ের নিচে বিস্তর নরম কার্পেট, ‎কিন্তু তার বুকের ভেতর যেন

‎তীক্ষ্ণ ভাঙা কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে আছে।

‎সানার বলা বাক্য গুলো কেমন তীরের মতো এসে তার বুকে গেঁথে যাচ্ছে। ‎‎আরজে এক হাত দিয়ে নিজের চুল চেপে ধরল, ‎রাগে নয়, ‎হতাশায় নয়,

‎বরং এমন এক অচেনা যন্ত্রণায়।‎

‎‎সানার নিরেট, শান্ত, অনড় মুখ

‎বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

‎কোনো কান্না নয়, ‎কোনো অভিযোগ নয়

‎শুধু এমন এক নীরবতা,‎যা হাজারটা শব্দের চেয়েও বেশি ধারালো।

‎‎এই নীরবতাই আজ আরজের বুকের ভেতর

‎একটা গভীর সাই*ক্লোন জাগিয়ে তুলেছে।

‎‎রাগ তার মাথায় ফের উঠতে চাইছিল,

‎কিন্তু সেই রাগের ভিতরেই ছিল

‎এক লুকোনো আতঙ্ক, ‎হারানোর ভয়।

‎‎তার দু'পাশে এসে দাঁড়ালো কাইলিন আর জ্যাক। তারা ‎কিছুই বুঝতে পারলো না।

শুধু ‎তারা দেখল ‎তাদের বসের চোখে আ*গুন নেই, ‎চোখে আজ শুধু ধোঁয়া,

‎একদম কালো, ভারী, গ্রাস করা ধোঁয়া।

‎‎আরজে কোনও কথা বলল না।

‎শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

__________________________

‎এসপি মাত্র ওয়াশরুমের দিকে যাবে এমন সময় তার সামনে আসে খুশদিল ফারুকী। উনি এসপিকে দেখেই তার ভ্রু কুচকে আসে। কেননা এসপির সারা ড্রেস জুড়ে আইসক্রিম। তিনি ব্যঙ্গ করে বলে ওঠেন,

-"তাহলে তুমি অবশেষে ঝাড়ুদারই হলে"

এসপি যেন আকাশ থেকে পড়ল, তার কণ্ঠে বিষ্ময়,

-"ঝাড়ুদার....!! আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি এসিস্ট্যান্ট।''

খুশদিল ফারুকীর চোখ বড় বড় হয়ে যায়।

-"তুমি ঝাড়ুদারের এসিস্ট্যান্ট ঝুড়িদার''

এসপির মুখের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর বিপরীতে শুধু মাত্র গা*লি দেওয়া ছাড়া আর কিছু আসছে না তার। মনে মনে বলে ওঠে,

'ঠাডা পড়ুক ঐ মুখে, যে মুখ দিয়ে আমাকে ঝুড়িদার বলেছে'

এসপি কিছু না বলে মুখটা অন্ধকার করে চলে যায়।এখানে থাকলে নিশ্চিত এই লোক তাকে 'রাজা*কার' 'আলবদর' বলে দিবে।

এদিকে খুশদিল বিড়বিড় করে আওড়ালো, -"আজকাল ঝাড়ুদারের ও এটিটিউড বেড়ে গেছে। যাই হোক আমি আমার মেয়েকে কোন ঝাড়ুদারের কাছে দিব না।"

__________________________

গিনির কাচঘেরা আটতম ফ্লোরে সারহাদের কেবিনটা সব সময়ই এক অদ্ভুত ঠাণ্ডায় মোড়া থাকে,যেন এ ঘরে প্রবেশ করলেই মানুষ নিজের ভেতরের সত্য থেকে পালাতে পারে না। কেবিনের দেয়ালে বিমূর্ত ছবি যেগুলো দেখে বোঝা যায় শিল্পীর মাথায় একটি স্বাভাবিক পৃথিবী ছিল না।

দরজাটা ধীরে খুলতেই আরজে নিঃশব্দ, বাঁধা-ছন্দে ভিতরে ঢুকল। তার ভিতরে শত ভাঙচুরের গোপন ঘূর্ণিঝড় থাকলেও মুখের ভাব তা প্রকাশ করতে ব্যর্থ।

সারহাদ আঙুলে ঘুরাতে থাকা কলম থামিয়ে মাথা তুলল। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি,

"মিস্টার জাওয়ান, আমি আপনার অপেক্ষায়ই ছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো আজ আসবেন না।"

সারহাদ নিজের কণ্ঠে গভীরতা এনে আবার শুধালো,

-"যখন মানুষ নিজের ভেতরে কিছু লুকায়, তখন সে দেরি করে।"

আরজে হেসে ওঠল শান্তভাবে, কিন্তু খুব মানবিক নয় এমন শান্ত।

"যে কিছু লুকায়, সে কখনো দেরি করে না, সারহাদ। সে ঠিক সময়েই আসে… যাতে অন্যরা গুলিয়ে যায়।"

সারহাদ একটু হেসে উঠল—

"আপনি সবসময় মানুষকে গুলিয়ে দেন। এজন্যই আপনাকে আমার পছন্দ। আর পছন্দ না হলেও… আপনাকে দরকার।"

আরজে চেয়ারে বসল।

"দরকার? নাকি আপনি আমাকে আপনার সিনেমার অদৃশ্য পরীক্ষাগারে রাখতে চান?"

সারহাদ আঙুল জোড়া লাগিয়ে বলে ওঠে,

"আপনি এত কিছু সন্দেহ করেন কেন? আমরা তো দুজনেই একই ধরনের মানুষ। বাইরের দুনিয়াকে আমরা দুজনেই ব্যবহার করি। পার্থক্য শুধু আপনি ব্যবহার করেন ক্যামেরার আড়ালে, আমি করি আলো আর অন্ধকারের মধ্যে।"

আরজে চোখ সংকুচিত করল।

-"যেহেতু আমার পরপর দুটো মুভির ডিরেক্টর আপনি তাই আমাদের সম্পর্কটাও আলো আর অন্ধকারের মতো হতে চলছে।"

তাদের কথায় কোনো রাগ নেই, কিন্তু কোন স্নিগ্ধতাও নেই। এটা এমন এক কথোপকথন যেখানে দুজনেই শব্দ দিয়ে একে অপরের মস্তিষ্কে পা ফেলছে সতর্ক, ধারালো, নিখুঁত।

সারহাদ ডেস্কের ড্রয়ার থেকে একটি ফাইল বের করল।

-"এই চরিত্রটা…একদম আপনার মতো মানুষের জন্য লেখা। যে ভেতরে পুরো ভাঙা, কিন্তু বাইরে ভীষণ নিয়ন্ত্রিত। বাই দা ওয়ে আপনি হয়ত স্কিপ্ট দেখেছেন যেহেতু সোফিয়া জাওয়ান প্রডিউসার"

আরজে পাতাগুলো দেখল। তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ফুটল।

-"হুম দেখেছি। তাই এটা আমি করতে চেয়েছি, কারণ চরিত্রটা আমি নই এটা শুধুমাত্র আমার একটা রূপ।"

সারহাদ এবার সত্যিকারের হাসল ঠাণ্ডা,

হীমধরা সেই হাসি,

-"ইউ নো আরজে, আমরা দুজনেই স্বাভাবিক মানুষের মতো নই। আপনার মাথার ভেতর যে নীরবতা, সেটা আমার গল্পে দরকার। আর আমার গল্পের অন্ধকার… সেটা আপনি ছাড়া কেউ ধরে রাখতে পারবে না।"

আরজে উঠে দাঁড়াল, হাতে স্ক্রিপ্ট,

-"রাইট"

সারহাদ মাথা নাড়ল,

-"এবার বিজনেসের ব্যাপারে কথা বলা যাক"

-"ইয়াহ, সিউর...."

কেবিনে আলো আরও ম্লান হয়ে গেল। ভিতরে

দুজন মানুষ নয়, বরং দুজন ছায়ার মতো, একটিতে আ*গুন, অন্যটিতে বরফ।

তাদের কথাবার্তায় এমন রহস্য, যা কেউ ধরতে পারে না, কিন্তু যারা শোনে, তারা জানে

পরবর্তী সিনেমাগুলো আর সিনেমা থাকবে না, হয়ে উঠবে ভয়, নীরবতা, আর নিয়ন্ত্রণের খেলা।

আরজে বেরোনোর আগে দেওয়ালের চিত্রকর্মগুলোর উপর দৃষ্টি পেলে, ঠান্ডা শীতল কন্ঠে বলে ওঠে,

-"আই লাইক ইউর পেইন্টিং"

সারহাদ কপালে কিছুটা ভাঁজ পেলে গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে,

-"ফার্স্ট টাইম, কেউ চিনতে পেরেছে এগুলো আমার করা পেইন্টিং।"

আরজের মুখের হাসি চওড়া হলো। সে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,

"The way one artist senses another, and one devil recognizes its twin in wickedness, A monster, too, never fails to recognize one of its own."

আরজে সারহাদের দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করতেই হঠাৎ সারহাদ ভয়ংকর শব্দের হাসিতে ফেটে পড়লো।

_________________________

আরজে সারহাদের কেবিন থেকেই বেরুতেই তার নজরে আসে সানা আর এসপি। সারহাদের কেবিনের সামনেই তার কেবিন। সানা সিরিয়াস ভাবে একটা জামার ডিজাইন করছে অদূরে দাঁড়িয়ে, হাতে তার কাঁচি আর ফিতা। আর এসপি তার চেয়ারে বসেই টেবিলে পা তুলে ভিডিও গেমস খেলছে। কিন্তু কেন জানি আরজের তা সহ্য হচ্ছে না। সে তাদের দিকে এগিয়ে যেতেই আয়ান তাকে আটকায়,

‎ -"স্যার কি করছেন এটা পাবলিক প্লেস"

‎রেগে গেল আরজে,

‎ -"বউ চলে গেলে পাবলিক আমার বউ এনে দেবে।"

-"কিন্তু স্যার....."

-"আমি কিছু জানি না, আমি পার্কিংলটে দাঁড়িয়ে আছি পাঁচ মিনিটে ওকে বলবে আসতে। না হলে তোমার খবর করবো আমি"

‎আরজে আয়ান কে চোখ রাঙিয়ে চলে যায়। বেচারা আয়ান করুন সুরে বলে উঠে,

‎ -"এবার তো মনে হচ্ছে আমার সানডে মানডে ক্লোজ হয়ে যাবে"

____________________

আয়ান এসে সানার দরজায় নক করে,

-"ম্যাম আসবো"

এদিকে সানা ভীষণ ব্যস্ত, সারহাদ তাকে নতুন ঐতিহাসিক কিছু ড্রেস ডিজাইন করতে বলেছে। আয়ানের কন্ঠ কানে আসতেই সে কিছু বলার আগেই এসপি বলে ওঠে,

-"না আজকে সানডে, আর না মানডে তাই আসা যাবেনা"

মুহূর্তে আয়ানের ভাব পরিবর্তন হয়ে গেলো। সে অনুমতির তোয়াক্কা না করেই দরজা ঠেলে ঢুকে এসপির সামনে দাঁড়ালো,

-"এই ইঁচড়েপাকা ছেলে, তুমি আমার ডায়লগ কে অপমান করেছো, আমি এক্ষুনি তোমার সানডে মানডে ক্লোজ করে দেব।"

-"আর আমি আপনার ফ্রাইডে টু স্যাটারডে সব ক্লোজ করে দেব"

-"আমি অভিশাপ দিলাম, তোমার চারটা বিয়ে হবে আর চার বউ মিলে তোমার চুল ছিঁড়...."

আয়ানের বাকি কথা সম্পন্ন হওয়ার আগেই এসপি ঘর কাঁপিয়ে বলে ওঠে,

-"আমিন.... আমিন... আমিন...."

সানা এদের ঝগড়ায় বিরক্ত হয়ে দুজনকে ধমকে ওঠে। আয়ান ঘড়িতে দেখে আর দুই মিনিট আছে। সে তাড়াতাড়ি সানাকে বলে ওঠে,

-"ম্যাম, স্যার আপনার জন্য পার্কিংলটে অপেক্ষা করছে। বলেছে আপনি না গেলে আমার সানডে মানডে ক্লোজ করে দিবে। প্লিজ.... প্লিজ.... প্লিজ.... ম্যাম,

সানা আর কথা বাড়ালো না সামনের দিকে পা বাড়ালো। আয়ান যাওয়ার আগে এসপির দিকে খেয়ে ফেলার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুখ ঝামটা মেরে চলে যায়।

এদিকে এসপি ভাবছে,

-"উপরওয়ালা আমি কি আরেকটা কে আমার পিছনে লাগিয়েছি"

________________________

সানা পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে ভাবছে,

'এই জাওরার আজকাল কি হলো, যখনই দেখি আমার সাথে চিপকে যায়'

সানার ভাবনার মধ্যে ভেসে আসে পুরুষালী হাস্কিস্বর,

-"ওয়াইফি, আপনি কি আসবেন নাকি আমি কোলে করে নিয়ে আসবো"

___________________

রাত আটটার দিকে হন্তদন্ত হয়ে আরজে সানার রুমে প্রবেশ করে। সানা একবার চোখ তুলে তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিল।

-"তুমি কি জানো তোমার ওই ফ্রেন্ড কি রকম? এক নাম্বারের 'বারোভাতারি'

-"আপনি নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে ওর পেছনে পড়ে আছেন কেন?"

-''তোমার ওই বারোভাতারি ফ্রেন্ড দুই ঘন্টায় পাঁচটা গার্লফ্রেন্ডর সাথে দেখা করেছে"

-"কি বলছেন কি!!!"

-"বিশ্বাস হয়নি তো? আমি তো আগেই বলেছি এসব ছেলে একদম ভালো না"

-"আরে রাখেন আপনার ভালো ছেলে। আমি ভাবছি এতটা অবনতি কিভাবে হলো ওর?"

-''অবনতি!!!"

-"অবনতিই তো, আগে মিনিটেই পাঁচটাকে পটিয়ে ফেলত, আর এখন দুই ঘন্টায়!!!!! আহারে,,,ছেলেটা দিন দিন ভালো হয়ে যাচ্ছে।"

আরজে:- 😵🤨😵‍💫

-চলবে...

More Chapters