#পর্বসংখ্যা১৫
#হ্রদয়ামিলন
#Shavakhan
দুবাইয়ের ধু ধু মরুবালিতে আরজের শুটিং চলছে পুরোদমে। ডিরেক্টর 'কাট' বলার সাথে সাথে ক্যামেরা থেমে যায়। আরজের অ্যাকশন সিন খতম হয়। রওনাক ছাতা হাতে পানির বোতল নিয়ে দৌড়ে আসে আরজের দিকে।
আরজে ড্রেসিং রুমে বসে। তার মেকআপ আর্টিস্ট জনি তার মুখে কিছু কাটা রক্তের দাগের মেকআপ করতে ব্যস্ত, তারপরের সিনের জন্য। পাশে ঈশানী বসে অনেকক্ষণ ধরে এটা সেটা বলে মাফ চাইছে।আজকে তার শুট নাই তারপরও এসেছে আরজের জন্য। কিন্তু আরজের দৃষ্টি তার হাতে থাকা মুঠোফোনে। পূর্ণ মনোযোগ সেখানে যেখানে সে সানাকে বারবার কয়েকটা নাম্বার থেকে মেসেজ পাঠাচ্ছে। আর সানা একটা একটা নাম্বার ব্লক করছে। কেন জানি তার ভীষণ মজা লাগছে বিষয়টা। মেয়েটাকে যতই অন্ধকার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে ততই মেয়েটার এসব অবাধ্যতা গুলো তাকে অন্ধকারে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিচ্ছে। যতদিন বাধ্য ছিল ভালো ছিল, অবাধ্য হয়ে এক অজানা অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। সানা কি তা জানে? একদমই না। আরজে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল,
-"আই লাইক দিস গেম ওয়াইফি, লেটস প্লে উইথ ইউ।"
এর মধ্যে কারো কল আসে আরজের কাছে। স্কিনে 'আয়ান' নামটা ভেসে ওঠছে। আয়ান আরজের পিএ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে। আরজে ফোন তুলতেই বলে,
-"বস সিসিটিভি ফুটেজ পেয়ে গেছি"
আরজে ওকে বলে রেখে দে। মেকআপ শেষে আরজে উঠে চলে যায় ঈশানীকে ফেলে।
____________________
গাড়িতে সানা মুখ বাকিয়ে বসে আছে। এসপি বিন্দাজ ভাবে গান ছেড়ে গাড়ি চালাচ্ছে।
-"তার মানে তুই আমাকে ড্রাইভিং শিখাবি না?"
এসপির সোজা সাপ্টা জবাব,
-"মরার আগে শিখিয়ে যাব। তুই মানে ডেঞ্জার আমি কোন রকম ডেড রিক্স নিতে চাই না।
-"আমি তোর চ্যাট গুলোর স্কিনশট ভাইরাল করব। তারপর শাহবাগীদের হাতে তোকে কেলানি খাওয়াবো।"
-"আচ্ছা আমার মা কালকে শিখাবো যাহ।"
সানা খুশি হয়ে যায়। এসপি আবারও বলে ওঠে,
-"আচ্ছা শোন পেস্ট্রি আমাকে না একটা ফ্ল্যাট নিতে হবে রে"
সানা ভ্রুকুটি করে তাকায়,
-"তোর এত বড় বাড়ি থাকতে তুই ফ্ল্যাট নিবি কেন? "
এইচপি করুন সুরে বলে ওঠে,
-''যমের সাথে এক বাড়িতে থাকা যায় নাকি বল?"
মুহূর্তে সানা ধরে ফেলে এসপির মানে, সে হাসতে হাসতে বলে,
-"তোর মামা এসেছে"
-"যম নিজের ছাওয়াল নিয়ে এসেছে"
____________________
অন্ধকার রুমে রকিং চেয়ারে বসে দুলছেন সোফিয়া জাওয়ান। সামনে একজনকে বেধড়কভাবে মারছে তার লোকেরা। কিন্তু তিনি নির্বিকার চিত্তে বসে আছেন। লোকটির চিৎকারে পুরো ঘর কেঁপে উঠছে। এই চিৎকার গুলো সোফিয়া মনে যেন একরকম পৈশাচিক আনন্দ দিচ্ছে। কাঠের মোটা দরজা ঠেলে প্রবেশ করে তার একান্ত অনুচর 'মুসাব'। পয়ত্রিশ ঊর্ধ্ব আফগান মুসাব একবার লোকটির দিকে তাকিয়ে সোফিয়ার দিকে তাকান। শীতল কন্ঠে বলেন,
-"লেডি"
সোফিয়া চোখ খুলে তাকায় মুসাবের দিকে। হাত নেরে বাকিদের চলে যেতে ইশারা করতেই সবাই চলে যায়। সোফিয়া মুসাবের দিকে জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে তাকায়। মুসাব ভিতরে ভিতরে খুবই ভয় পেয়ে আছে কিভাবে বলবে সোফিয়াকে,
-"লেডি আমাদের একটা কারখানায় কেউ আগুন লাগিয়েছে? কিন্তু প্রেসের লোকেরা এটাকে মালিক পক্ষের ভুল বলে দাবি করছে"
সোফিয়ার মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। ত্রুোধান্বিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলেন,
-"কার এত বড় সাহস সোফিয়ার দিকে আঙ্গুল তুলছে? আর ওই আগুন কিভাবে লেগেছে তার খবর নিয়েছো?"
মুসাব কণ্ঠ নিচু ভয় স্পষ্ট,
-"লেডি মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছে করে লাগিয়েছে। আপনার জন্য একটা চিরকুট রেখে গেছে।"
সোফিয়া মুসাবের দিকে তাকায়,
-"কিসের চিরকুট?"
মুসাব নিজের পকেট থেকে বের করে চিরকুট খানা সোফিয়ার হাতে দিয়ে দেয়। সোফিয়া একটানে উপরের কাগজটা ছিড়ে ফেলে। ভিতরে একটি কার্ড বেরিয়ে আসে যাতে লেখা আছে,
-"All the Jaowan's, be ready for destroy"
সোফিয়া কার্ডখানা উল্টে দেখেন তার পেছনে লেখা আছে গুটি গুটি অক্ষরে,
-"Master"
সোফিয়া শক্ত হাতে কাগজ খানা চেপে ধরে মুসাবের দিকে রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলেন,
-"কে এই মাস্টার, তার এত বড় কলিজা আমি ওর কলিজা দেখতে চাই"
-"লেডি এখনো তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি"
সোফিয়া চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন,
-"খোঁজ নাও নাহলে নিজের জন্য কবর খুঁড়ো।আর সানা আর আরজের ডিবোর্সের কাজ কতদূর?"
-"প্রায় শেষদিকে"
-"আচ্ছা তুমি যাও"
মুসাব জি লেডি বলে চলে যায়। সোফিয়া নিজে নিজেই বলে ওঠে,
-" আমি আরজের চোখে সানার জন্য ঐদিন দুর্বলতা দেখেছি। আর আমার সাম্রাজ্যে দুর্বলতা মানেই ধ্বংস।"
সোফিয়া নিজের মাথায় দুই আঙুল চেপে ধরে বসে পড়েন। ভাবেন 'কে এই মাসটার? কি চাই তার?' সোফিয়ার মনে পড়ছে না সে তার এমন কোনো শত্রুকে জীবিত রেখেছে। তাহলে কে?'
__________________
রাত আটটার উপরে বাজে সানা বাড়িতে আসে। একে তো রাস্তার ট্রাফিক তার উপরে গিনি থেকে তার ফ্ল্যাট একটু দূরেই।কিন্তু পার্কিংলটে পা রাখতেই তার ষষ্ঠইন্দ্রিয় তাকে বলছে, কেউ তাকে দেখছে। সানা এদিক-ওদিক তাকায়, নাহ কেউ নেই। হঠাৎ তার চোখ পড়ে পাশের একটা গাড়ির সাইড ভিউ মিররে যেখানে দেখা যাচ্ছে কালো মাস্ক পরা এক ব্যক্তি, নীলাভ মনি দিয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। ডান দিকের সারির গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে। মুহূর্তে সানার মাথায় কিছুটা ক্যাচ করে গেল। সে নিজের ব্যাগে হাত দিয়ে দেখে নিজের আত্মরক্ষার জন্য কিছুই নেই। সানা নিজের মোবাইলটা বের করে এসপির সাথে কথা বলার ভান করে লিফটের দিকে এগিয়ে যায়। লিফটের সামনে এসে এক দৌড়ে লিফটে ঢুকে সেভেন এ প্রেস করে দেয়। পিছনে থাকা মাস্টার সানার মতলব বুঝতে পেরেই সেও দৌড়ে যায়। নিজের ড্রাগন ট্যাটু খচিত হাতখানা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ততক্ষণে লিফট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সানা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তার শ্বাস উঠানামা করছে দ্রুত। নিজেকে ধাতস্থ করতেই তার প্রেস করা ফ্লোর এসে গেল। সে এক ছুটে ব্ল্যাক স্পেসে চলে যায়।
_____________
পার্কিংলটে দাঁড়িয়ে থাকা মাস্টার উচ্চশব্দে হেসে ওঠে। নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন পার্কিং লটে কি ভয়ংকর শোনাচ্ছে সেই হাসি। ইচ্ছে করেই সানা কে ছেড়ে দিয়েছে। এত তাড়াতাড়ি সে কাউকে ধরবে না। বাতাসে ভেসে আসছে তারই ইলেকট্রনিক শব্দ,
-"People run when they are afraid, but running only reveals they're location. And that calculation , I know too well.
সানা ফ্ল্যাটে ঢুকতেই দেখে মিসেস আয়েশা। তিনি সানার চোখে মুখে চিন্তার চাপ দেখে জিজ্ঞেস করেন,
-"সানা তুমি ঠিক আছো?"
সানা চোখ তুলে ওনার দিকে তাকিয়ে শুধালো,
-"জি আমি ঠিক আছি"
-"তুমি এত রাতে...."
সানা ওনার কথা কেটে তড়িঘড়ি করে বলে ওঠে,
-"একচুয়ালি আমার কিছু কাজ ছিল নিচে"
মিসেস আয়েশা একটু হেসে বলেন,
-"ওহ আচ্ছা। আর হ্যাঁ আরজে কল করে তোমাকে খুঁজছিল"
সানা ভ্রুকুটি করে তাকায়,
-"আমাকে কেন?"
-"তোমাকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করেছে"
-"কেন?"
-"আমাকে তো বলেনি। আর তোমাকে বলেছে কল দিতে"
সানা আচ্ছা বলে চলে যায় রুমে। তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে পার্কিং লটে থাকা অজ্ঞাত ব্যক্তির কথা। সে সত্যিই কি সানার পেছনে পড়েছিল নাকি অন্য কিছু? ভাবছে এসপিকে বলবে কিনা, বললে আবার যদি টেনশন করে। আর এদিকে আবার রানভীর! কি চাইছে ও নিজেই জানে না। ধুর... এত টেনশন সানার আর ভালো লাগেনা। কাল সব হবে। সানা সব ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়ে
___________________
একটা ছোটখাটো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে আরজের বুর্জ খলিফে থাকা আশিতলার ফ্ল্যাটটিতে। মনে হচ্ছে কেউ তান্ডবলীলা চালিয়েছে এখানে। কিন্তু যার জন্য এই অবস্থা সেও অদূরে বসে আছে নির্বিচার চিত্তে। আরজের হাত দিয়ে রক্ত ঝরছে, চুলগুলো সব এলোমেলো। সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনে পড়ে থাকা মোবাইলের স্কিনে যেখানে দেখা যাচ্ছে, সানা আর এসপিকে একসাথে রেস্টুরেন্টে। হ্যাঁ এটা ওই দিনের সিসিটিভি ফুটেজ ছিল। সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ আরজে ওই দিনে চেয়েছিল, কিন্তু কিছু সমস্যার কারণে তা আসতে লেট হয়েছে। আয়ান আজকে এটাই পাঠিয়েছিল। দরজার নব ঘুড়িয়ে প্রবেশ করে চাইনিজ গার্ড 'কাই লিন' চারপাশে তাকিয়ে তার আর বুঝতে অসুবিধা হয়নি কি হয়েছে এখানে। সে নিঃশব্দে হেঁটে যায় আরজের সামনে,
-"বস কাল আপনার কনসার্ট। তারপর দিন...."
তার কথা কেটে আরজে রুক্ষ আর গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে,
-"আমি বিডিতে ব্যাক করব"
-"কিন্তু বস আমাদের তো"
কাইলিনের জিহবা খসে বাকি কথাটুকু আর বের হলো না।আরজে তার দিকে চোখ তুলে তাকাতেই কাইলিনের কথা বন্ধ হয়ে যায়। আরজের চোখ দিয়ে যেন রক্ত ঝরছে। আরজে পড়ে থাকা মোবাইলটিকে হাতে তুলে আরো একবার ছবিটা দেখে দেওয়ালের দিকে জোরে ছুড়ে ফেলে দেয়। মুহূর্তে ফোন খানা কয়েক পার্টেবিভক্ত হয়ে পড়ে। সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই আরজে শক্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,
-"আজ থেকে সবকিছু শুরু ওয়াইফি। আমি দূরত্ব বাড়িয়েছি তোমাকে ধ্বংস থেকে বাঁচাতে। কিন্তু তুমি নিজেই ধ্বংসকে উসকে দিলে। এখন তুমি শত চাইলেও আর মুক্তি পাবে না। বি রেডি ওয়াইফি।"
_________________
এসপি সানাকে ডাইভিং শিখাচ্ছে কিন্তু এসপির মনে হচ্ছে আজ তার শেষ দিন,
-"আবে এক্সেলেটর থেকে পা সরিয়ে বেকে চাপ দেয়এএএএএএ"
-"কিন্তু কোনটাই তো কাজ করছে না"
-"তাহলে কন্ট্রোলারে চাপ দেয়এএএএএএ"
-"আরে এটাও চলছে না"
-"আমার মা কি চলছে সেটা বললললল?"
-শু...শুধু গাড়ি চলছে আর স্টিয়ারিং ঘুরছে"
-"তুই স্টিয়ারিং থেকে হাত সরাবি নাহহহহ আজরাইল পিছনের সিটে বসে আছে তুই হাত সরাবি আর আমরা উপরওয়ালার কাছেএএএএএ...
হে মাবুদ, আজ আমার সব পাপের কথা মনে পড়ছে। হে জাতি আমাকে মাফ করো... এই কটকটির জন্য আমি জীবনের অন্তিম মুহূর্তেএএএএ..…..."
-চলবে....
