#পর্বসংখ্যা১০
#হ্রদয়ামিলন
#Shavakhan
মিসেস সোফিয়া জাওয়ান সর্বসাধারণের কাছে তিনি শান্ত, মার্জিত, ভদ্র এক নারী। আচরণ এতটাই পরিশীলিত যে অনেকেই তাকে আদর্শ চরিত্র ভাবতে ভুল করে না। তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, কথা মেপে বলা। কিন্তু তার কাছের মানুষেরা জানে সোফিয়ার সাম্রাজ্য আসলে তৈরি অহংকারের সূক্ষ্ম ইট দ্বারা। অপমান তিনি সহ্য করতে পারেন না। মতের বিরোধিতা হলে, চোখের কোণে অদৃশ্য আগুন জ্বলে ওঠে। তার চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকে গোপন সাম্রাজ্যের রানীর আদেশমাখা দৃঢ়তা।
সানা মিসেস সোফিয়া সাথে কথা বলে হেলে দুলে বিজয়ী ভঙ্গিতে রুমে যাচ্ছে। এমন সময় তার পেছন থেকে নাতাসার আওয়াজ আসলো,
-"সানা"
সানা পিছন ফিরে তাকালো।নাতাসা তার দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে,
-"লিসেন সানা, আমার তোমার সাথে কথা বলতে কোন ইন্টারেস্ট নাই"
সানা মনে মনে ভাবছে 'পাগল নাকি, না তারছিড়া। নিজে কথা বলতে এসেছে আবার নিজেই বলছে কোন ইন্টারেস্ট নেই। বাংলা সিনেমা পেয়েছে নাকি, দাঁড়া দেখাচ্ছি'। হঠাৎ সানা চোখে মুখে উদ্বেগ নিয়ে চিৎকার করে ওঠল,
-"নাতাসাআআআ....."
নাতাসা ভয় পেয়ে গিয়েছে,
-"কি... কি... কি হয়েছে?"
-"তোমার,,,,,, তোমার কাধেঁর পেছনে....."
নাতাসা আরো ভয় পেয়ে গেল। তার কন্ঠ কাঁপা, ভয় স্পষ্ট,
-"কি? কি আমার পিছনে?"
-"একটা ইয়াবড় টিকটিকিইইইই...."
নাতাসা যেন আকাশ থেকে পড়লো। সে জোরে চিৎকার করে উঠলো। সে অলরেডি লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে,
-" সানা প্লিজ.... এটা সরাও?"
-"কিন্তু নাতাসা আমি কিভাবে?"
নাতাসা এবার কাঁদো কাঁদো, সে আর একটু হলেই কেঁদে দিবে। পারছে না সানার হাতে পায়ে ধরে ফেলে,
-"প্লিজ... প্লিজ.. প্লিজ... ডু সামথিং, আই নো ইউ ক্যান হ্যান্ডেল ইট। প্লিজ.....
-"ওকে ওকে আমি দেখছি।"
সানা নিজের ভিতরে হাসি চেপে মেকি হাত নেড়ে তাড়ানোর ভঙ্গি করল। নাতাসা ভয়, অস্বস্তি আর কেঁদে ফেলা মুখ নিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো, সানা পেটে হাত দিয়ে হাসছে। তার এবার সন্দেহ হলো, সে ঘাড় কাঁত করে নিজের পিছনে দেখলো কিছুই নেই। মুহূর্তেই তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো। সে কিছু বলবে সানা তার কথার মাঝে ফোঁড়ন কেটে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিল,
-"এক সেকেন্ড আমারও শেওড়া গাছের পেত্নীদের সাথে কথা বলার কোন ইন্টারেস্ট নেই"
নাতাসা বুঝতে পারেনি সানা এটা কি বলেছে। তাই সে জিজ্ঞেস করল,
-"শেওড়া গাছের পেত্নী আবার কি?"
সানা ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-"সার্চ ইট অন চ্যাট জিপিটি"
এই বলে সে চলে গেল। এদিকে নাতাসা মোবাইল নিয়ে চ্যাট জিপিটিকে ভয়েস পাঠালো, সাথে সাথেই ভেসে এলো একটা রূপকথার পেত্নীর মুখ। সে প্রথম দেখাতেই ঘাবড়ে গেল। 'আহ' করে উঠলো, একটুর জন্য তার হাত ফসকে মোবাইলটা পড়েনি।সে ছবিটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল,মনে মনে ভাবল,'আমি কোন দিক দিয়ে এমন দেখতে' তবে তার মাথাটা গরম হয়ে এলো যখন নিচের লেখাটুকু পড়তে শুরু করল। সে মোবাইলটা শক্ত করে ধরে জোরে চিৎকার করে ওঠল,
-"সানাআআআ..."
_______________
সানা হাসতে হাসতে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো। তখনই নজরে এলো আরজে করিডোরের অপরপ্রান্ত থেকে আসছে। তাকে দেখেই সানা বুঝতে পারলো, নিশ্চয়ই সানার সাথে কথা বলতে আসছে। কিন্তু তার এই জাওরার সাথে কথা বলার ইচ্ছা নেই। সে আরজেকে একটা বাঁকা হাসি উপহার দিয়ে, রুমের দিকে ছুটে গেল। আরজে অদূরে দাঁড়িয়ে দেখছে সানা কি করছে। তার বুঝতে একটু সময় লাগলো, কিন্তু যখনই বুঝতে পারল ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। আরজে দৌড়ে রুমে ঢুকবে তার আগেই সানা তার মুখের উপর ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিল। সে বুঝতে পেরেছিল এই মেয়েটা এটাই করবে। আবার.... আবার তার মুখের উপর সানা এই কাজটা করল। আরজের এমন মনে হলো সানা তার আত্মসম্মানে দুই দুবার ঠাস করে থাপ্পর মারল। সে দরজার হ্যান্ডেল ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,
-"সানা,,, ওপেন দা ডোর। সানা,,,,,"
নাহ্ ওদিক থেকে কোন আওয়াজ আসছে না। সে এবার দরজায় করাঘাত করলো,
-"সানা, ইউ ইডিয়েট... ওপেন দা ডোর। দ্যাটস নট আওয়ার হোম।"
না সে জোড়ে চিৎকার করতে পারছে, না এই মেয়েটা দরজা খুলছে। ঠিক ওই সময় আরজে পেছন থেকে কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল। সে পিছন ফিরে দেখল, দুজন সার্ভেন্ট এদিকে আসছে। আরজে তাড়াতাড়ি সটান হয়ে দাঁড়াল, ঠিক একদম পরিপাটি করে নিল নিজেকে ভাব এমন যেন, 'এখানে কিছুই হয়নি'। কেউ যদি জানতে পারে, তার যেই সুদর্শন চেহারা দেখার জন্য এত মেয়েরা পাগল সেই মুখের উপর তার বউ এভাবে 'ঠাস' করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে তাহলে তার সম্মান মাটিতে গিয়ে ঠেকবে। সার্ভেন্টরা তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
-"স্যার কিছু লাগবে?"
-"না আপনারা যেতে পারেন"
-"ওকে স্যার"
সার্ভেন্ট দুজন চলে গেল আরজের দৃষ্টিসীমার বাইরে। তারপরও সে দুদিকে উঁকি দিয়ে দেখল কেউ আছে কিনা। না কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সে আবার মুখের পুনর্ভাব ফিরিয়ে আনলো। সানার রুমের কাছে এসে দরজাতে কয়েকটা টোকা দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
-"দেখো সানা ভালো হবে না কিন্তু বলে দিচ্ছি, যদি একবার তোমাকে হাতের কাছে পাইনা তখন বোঝাবো মজা। সানা..... সানা....."
সানা দরজায় কান লাগিয়ে তার কথা শুনছে আর হাসছে। সানার মনে পড়ছে অনেক আগে একদিন আরজে এভাবেই তার মুখের উপর ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।ঐদিন ওর এতটাই খারাপ লেগেছে।
আরজে সানাকে দশ মিনিটের মতন ডেকে নিজের রুমে চলে গেল। কাল সকালেই তার ফ্লাইট। সানা হাসতে হাসতে এসপিকে কল করতে চলে গেল। এসপি ভিডিও কল ধরতেই ভেসে উঠলো সানার হাসিমাখা মুখ,
-"বেস্টি তুই জানিস ওদের অবস্থা কি হয়েছে?"
-"আবে ইয়ার তুই যেখানে ওদের অবস্থা কি ভালো হবে "
সানা কিছুটা হাসি দমন করে বলল,
-"তবে আমার মনে হচ্ছে আমি একটা অদ্ভুত চিড়িয়াখানায় ফেঁসে গেছি রে"
-"কেমন চিড়িয়াখানা?"
-"দেখ না একদিকে ওই কালনাগিনী, অন্যদিকে শেওড়া গাছের পেত্নী, সামনে ইংরেজ বংশধর চাচুমা, আর পেছনে রাণভীর জাওরা। কপাল সবই আমার কপাল"
এসপি হেসে হেসে বললো,
-"ক্লাস কেমন নিলি ওদের"
-"একদম সেকেন্ড ক্লাস। আজকে শুরু তাই সেকেন্ড ক্লাস নিয়েছি, ধীরে ধীরে ফার্স্ট ক্লাস নেব"
মুহূর্তে দুজনে হেসে লুটোপুটি, এসপি হাসি থামিয়ে সিরিয়াস হয়ে বললো,
-"কাল থেকে তোর ক্লাস মনে আছে তো"
-"হ্যা, মনে আছে"
-"আমি সকাল দশটায় নিতে আসবো"
-''ওকে"
এসপির কিছু মনে হওয়াতে সে আবারও বললো,
-"আচ্ছা শোন তুই ওই সময় যে বলেছিস পার্কিংলটে কেউ ছিল, পড়ে আমি যেতে চেয়েছিলাম তুই আমাকে নিষেধ করেছিলি।কেন?"
-"মনে হচ্ছে আমি ভুল দেখেছি"
এসপির ভাবাবেগ পরিবর্তন হলো না,
-"কোথাও ওই কালনাগিনী তোর পিছনে কাউকে লাগাইনি তো?"
সানা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-"আই সোয়ার, এসপি ওই কালনাগিনী যদি আমার পিছনে কাউকে লাগায় না, আমি ওর পেছনে কিং কোবরা লাগাবো"
-"আপাতত ও তোর পেছনে রাসেল ভাইপার লাগিয়েছে"
এভাবে আরো কতক্ষণ ধরে চলতে থাকলো তাদের কথোপকথন। কখনো এটা তো কখনো ওটা।
__________________
মিসেস সোফিয়া রাতে ঘুমাতে পারছেন না। সানার কথা তাকে বারবার ভাবতে বাধ্য করছে। তিনি চেপে না রাখতে পেরে আরজের রুমের দিকে আসলেন। আরজে নিজের রুমে স্কিপ্ট দেখছিল। এমন সময় কেউ দরজার কড়া নাড়লো। সে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো, মিসেস সোফিয়া। সে চোখ আবার স্কিপ্টে রেখে শীতল কন্ঠে শুধালো,
-"মম কিছু বলবে?"
তিনি আরজের দিকে অগ্রসর হলেন,
-"হা ব্যাটা, তুমি কি বেশি বিজি"
-"না, তুমি কি বলবে, বলো?"
-"একচুয়ালি ব্যাটা, সানা কেমন অদ্ভুত বিহেভ করছে?"
আরজে ভীষণ বিরক্ত তার মা প্রতিবার সানার নামে তার কাছে হাজারটা নালিশ বলবে। কিন্তু কোনদিনও সে এই বিষয়ে তার মায়ের মুখের উপর কিছু বলেনি। কারণ সে তার মায়ের হিংস্রতা সম্পর্কে অবগত। সে নিজের কাজে মন দিল। মিসেস সোফিয়া এক নিঃশ্বাসে সব বলতে থাকলেন। কিন্তু শেষের একটা কথা আরজে কে রাগিয়ে দিল, যখন মিসেস সোফিয়া তার আর সানার ডিভোর্সের কথা বললো। তখনই আরজে তার মাকে থামিয়ে দিল,
-"মম... প্লিজ, আমি এই বিষয়ে কোন কথা বলতে চাই না। আই নিড সাম রেস্ট।"
মিসেস সোফিয়া কথা বাড়ালেন না। 'ওকে' বলে চলে গেল। তবে মনে মনে তিনি ঠিক করে নিলেন সানা কে আর রাখা যাবে না।
আরজে যেন হাফ হাত ছেড়ে বাঁচলো।
__________________
সকাল আটটার আগে ঈশানী আর আরজে বেরিয়ে পড়ল এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। দশটায় তাদের ফ্লাইট, তার আগে তাদের সেটে কিছু কাজ আছে। সানা ঘুম থেকে উঠেছে নয়টায়। সে আজকে ফ্ল্যাটে চলে যাবে, সেখান থেকে তাকে ক্লাস করতে হবে। আরজে যাওয়ার আগে রিয়ানার কাছে সানাকে দেওয়ার জন্য একটি ক্রেডিট কার্ড দিয়ে গিয়েছে। সে থাকবে না যদি সানার কাজে লাগে। রিয়ানা সকালে সানা কে দেখেই তাকে তার কার্ড বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেছে। সানার সাথে না তার ঝগড়ার সম্পর্ক না বন্ধুত্বের। সে নিজের মতো থাকে।
সানা রেডি হয়ে নিচে গিয়ে দেখে নাতাসা আর সোফিয়া কোম্পানির বিষয়ে আলোচনা করছে। হাতে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এক সেকেন্ডে তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। সানা কে নামতে দেখে দুজনই না দেখার ভান করে মুখ বাঁকিয়ে বসে থাকলো। নাতাসার হাতে কোল্ড কফি, সানা তার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময়েই তাকে হালকা করে একটা ল্যাং দিল। এতটা সূক্ষ্ম ভাবে যে অপাত দৃষ্টিতে তা বুঝার অবকাশ নেই। নাতাসা নিজের ব্যালেন্স হারিয়ে মিসেস সোফিয়ার দিকে পড়ে গেল। তার হাতের কপি পড়ল সোফিয়ার হাতে থাকা ফাইলে আর তার পোশাকে। সোফিয়া তৎক্ষণাৎ রেগে গেলেন,
-"হোয়াট দা হেল ইজ দিস নাতাসা। তুমি জানো ফাইলে দশ কোটি টাকার ডিল রয়েছে, এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।"
নাতাসা কি বলবে বুঝতেই পারছেনা। সে হঠাৎ কিভাবে পড়ে গেল সেটাও বুঝতে পারছে না। নাতাসা অনুতপ্ত হয়ে বলল,
-"আম সরি বড়মা, আমি বুঝতে পারিনি"
কিন্তু মিসেস সোফিয়া বোঝার মানুষ নয়, তিনি নাতাসার উপর চিৎকার করতে শুরু করলেন। সানা মুচকি হেসে চলে গেল।
___________________
দশটায় ফ্লাইট, কিন্তু আরজের মনে আধাঁরের ঘনঘটা। তার প্রথমবারের মতো মনে হল সে কোন ইম্পোর্ট্যান্ট জিনিস ফেলে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না তার এমন কেন মনে হচ্ছে, যেন কাছের কাউকে সে অতি শীঘ্রই হারাতে চলছে। তার এই অস্থিরতা বেড়েই চলতে থাকলো। এক সময় ডিরেক্টর এসে তাড়া দিল,
-"আরজে আমাদের এখনি যাওয়া উচিত"
আরজে সামনের দিকে পা বাড়িয়ে আবার কিছু মনে করে ডিরেক্টর কে বললো,
-"আমার একটা কাজ আছে, আমি আসছি"
এই বলে কোন দিকে না তাকিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
-চলবে.....
