Ficool

Chapter 1 - Unnamed

Chapter1...রাতটা ছিল অদ্ভুত নীরব। শীতের কুয়াশায় ঢাকা ছোট্ট শহরটা যেন নিজের ভেতরেই গুটিয়ে ছিল। স্টেশনের বেঞ্চে বসে নীল চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। আজ ঠিক এক বছর হলো মেঘলা নেই।

মেঘলার সঙ্গে নীলের পরিচয় হয়েছিল কলেজের লাইব্রেরিতে। মেঘলা সবসময় জানালার ধারে বসত, আর বইয়ের পাতার ফাঁক দিয়ে আড়চোখে নীলকে দেখত। একদিন হঠাৎ করে বৃষ্টি নেমে গেল। সবাই দৌড়ে ছুটল, কিন্তু মেঘলা দাঁড়িয়ে রইল বারান্দায়। নীল ছাতা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বলেছিল,

— "ভিজে গেলে জ্বর হবে।"

মেঘলা হেসে বলেছিল,

— "তুমি পাশে থাকলে জ্বরও ভালোবাসা হয়ে যাবে।"

সেই হাসিটাই ছিল নীলের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

ধীরে ধীরে তাদের ভালোবাসা শহরের অলিগলি, চায়ের দোকান, নদীর ধারে বিকেল—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। নীল চাকরি পেল অন্য শহরে। যাওয়ার আগে মেঘলা বলেছিল,

— "প্রতিদিন রাতে ফোন করবে, না হলে আমি ঘুমাব না।"

নীল হেসে বলেছিল,

— "আমি না ফোন করলে চাঁদও উঠবে না।"

কিন্তু জীবন তো প্রতিশ্রুতির চেয়েও কঠিন।

চাকরির ছয় মাস পর হঠাৎ এক রাতে ফোন এল। অপরিচিত কণ্ঠ—

"আপনি কি নীল? মেঘলা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে…"

হাসপাতালের সাদা দেয়াল, স্যালাইনের ফোঁটা, আর নিস্তব্ধ বিছানায় শুয়ে থাকা মেঘলা—সবকিছু যেন দুঃস্বপ্ন। মেঘলার ঠোঁট ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখদুটো নীলকে দেখেই ভিজে উঠল।

— "তুমি তো বলেছিলে… ফোন না করলে চাঁদ উঠবে না… আজ চাঁদ উঠেছে?"

নীলের গলা কাঁপছিল,

— "না… আজ আকাশ অন্ধকার।"

মেঘলা ধীরে বলল,

— "তাহলে… আমিও যাই… অন্ধকারে তোমার জন্য একটা তারা হয়ে থাকব…"

সেই রাতেই মেঘলা চলে গেল। কোনো চিৎকার ছিল না, শুধু নীলের হাত শক্ত করে ধরা ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

তারপর থেকে নীল প্রতিরাতে আকাশের দিকে তাকায়। শহরের সবাই ভাবে সে পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু নীল জানে, একটা তারা অন্যসব তারার চেয়ে একটু বেশি জ্বলে। ওটাই মেঘলা।

আজ স্টেশনে বসে নীলের হাতে একটা পুরোনো চিঠি। মেঘলা মৃত্যুর আগে লিখেছিল—

"নীল, যদি কখনো আমি না থাকি, তাহলে কাঁদবে না। আমি চাই না তোমার চোখের জল আমার জন্য ঝরে। তুমি হাসবে, বাঁচবে, নতুন কাউকে ভালোবাসবে। কারণ ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না, মানুষ শেষ হয়ে যায়। যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, তবে আমাকে মুক্তি দাও তোমার কান্না থেকে।"

চিঠিটা পড়তে পড়তে নীলের চোখ ভিজে যায়। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,

— "আমি চেষ্টা করছি, মেঘলা… কিন্তু তুমি ছাড়া হাসি আসে না।"

ঠিক তখনই ট্রেনের হুইসেল বাজে। পাশের বেঞ্চে বসা ছোট্ট এক মেয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলছে,

— "বাবা, তুমি গেলে আমি কাঁদব।"

নীল হঠাৎ বুঝতে পারে, ভালোবাসা কাউকে ধরে রাখার নাম নয়, বরং কাউকে ছেড়ে দিয়েও তার সুখ কামনা করার নাম।

সে উঠে দাঁড়ায়। চোখের জল মুছে নেয়। আকাশে সেই উজ্জ্বল তারাটার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,

— "আমি বাঁচব, মেঘলা। তোমার জন্যই বাঁচব।"

আকাশের তারা যেন একটু বেশি ঝলমল করে ওঠে।

আর নীলের চোখ দিয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ে—দুঃখের জন্য নয়, এক অমর ভালোবাসার জন্য।

More Chapters