Ch1
Ami akti golpo likhchi
রাতের শেষ প্রহরে গ্রামের আকাশে তখনো ফিকে তারা জ্বলছে। দূরে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে হালকা কুয়াশা ভেসে আসছে। সেই গ্রামের নাম শালবনপুর। সেখানে থাকত এক গরিব কৃষকের ছেলে—রাকিব। ছোট্ট কাঁচা ঘর, টিনের চালা, উঠানে আমগাছ—এই ছিল তাদের সংসার। বাবা সারাদিন মাঠে কাজ করতেন, মা অন্যের বাড়িতে সেলাই করতেন। অভাব ছিল, কিন্তু স্বপ্নের অভাব ছিল না।
রাকিব ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিল। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর আর পড়া চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। সংসারের চাপ বাড়ছিল। একদিন রাতে মা ভাত পরিবেশন করতে করতে বললেন,
— "বাবা, তুই যদি শহরে গিয়ে একটা কাজ খুঁজে নিতে পারিস, তাহলে হয়তো আমাদের কষ্টটা একটু কমবে।"
রাকিব চুপ করে রইল। তারও মনে শহরে গিয়ে কিছু করার স্বপ্ন অনেকদিনের। কিন্তু ভয়ও ছিল—অজানা শহর, অচেনা মানুষ। তবুও এক সকালে বাবা তার হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বললেন,
— "এটাই আমাদের সঞ্চয়। সাবধানে খরচ করিস। হাল ছাড়িস না কখনো।"
চোখ ভরা জল নিয়ে রাকিব রওনা দিল শহরের উদ্দেশ্যে।
---
শহর যেন এক অন্য জগৎ। উঁচু উঁচু দালান, গাড়ির হর্ন, মানুষের ভিড়—সবকিছুই নতুন। প্রথম দিন সে একটি সস্তা মেসে উঠল। দুদিন বিশ্রাম নিয়ে শুরু করল চাকরি খোঁজা। সে অফিসে অফিসে ঘুরতে লাগল, দোকানে দোকানে খোঁজ নিতে লাগল। কেউ বলত, "অভিজ্ঞতা আছে?"—না থাকলে কাজ নেই। কেউ বলত, "ভ্যাকেন্সি নেই।" কেউ আবার সরাসরি দরজা বন্ধ করে দিত।
এক সপ্তাহ কেটে গেল। তার পকেট থেকে টাকা কমতে লাগল। মেসের ভাড়া, খাবার খরচ—সব মিলিয়ে সঞ্চয় দ্রুত শেষ হচ্ছিল। তবুও সে হাল ছাড়ল না। প্রতিদিন সকালে বের হতো, সিভি হাতে ঘুরে বেড়াত।
একদিন দুপুরে প্রচণ্ড রোদে ক্লান্ত হয়ে সে এক পার্কের বেঞ্চে বসে পড়ল। সেদিন তার পকেটে মাত্র একশো টাকা বাকি। পেটে ভাত নেই, চোখে হতাশা। সে ভাবল, "আমি কি ভুল করলাম? গ্রামেই থেকে গেলে হয়তো অন্তত দুবেলা ভাত পেতাম।"
কিন্তু মায়ের কথা মনে পড়ল—"হাল ছাড়িস না।"
---
আরও কয়েকদিন পর তার টাকা একেবারেই শেষ হয়ে গেল। মেসের মালিক বলল,
— "টাকা না দিলে থাকতে পারবে না।"
রাকিব বাধ্য হয়ে মেস ছাড়ল। এক রাত সে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কাটাল। ক্ষুধায় মাথা ঘুরছিল, কিন্তু সে ভিক্ষা চাইল না। নিজের সাথে নিজেই বলল, "আমি কাজ চাই, দয়া নয়।"
পরদিন সকালে সে একটি বড় অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছিল না। তখনই এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?"
রাকিব সব খুলে বলল—গ্রামের কথা, পরিবারের কথা, চাকরি না পাওয়ার কথা। ভদ্রলোক মন দিয়ে শুনলেন। তিনি ছিলেন সেই অফিসের মালিক, নাম আরিফ সাহেব।
আরিফ সাহেব কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
— "তোমার অভিজ্ঞতা নেই, কিন্তু তোমার চোখে আমি সততা দেখছি। আপাতত অফিস সহকারীর কাজ করতে পারবে?"
রাকিবের চোখে জল চলে এলো। সে বলল,
— "স্যার, আমি যে কোনো কাজ করতে রাজি।"
---
সেখান থেকেই তার নতুন জীবন শুরু। প্রথমে ছোটখাটো কাজ—ফাইল গুছানো, চা আনা, ডকুমেন্ট পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সে প্রতিটি কাজ মন দিয়ে করত। সময়মতো অফিসে আসত, রাত পর্যন্ত থেকে কাজ শিখত। কম্পিউটার জানত না, তাই সহকর্মীদের কাছে শিখতে লাগল। ভুল করলে শিখে নিত, কখনো বিরক্ত হতো না।
ধীরে ধীরে আরিফ সাহেব তার উপর আস্থা রাখতে শুরু করলেন। একদিন তিনি বললেন,
— "রাকিব, তুমি কি হিসাবের কাজ শিখতে চাও? আমি তোমাকে সুযোগ দিতে পারি।"
রাকিব আনন্দে রাজি হলো। রাতে সে অনলাইনে ফ্রি কোর্স করে হিসাববিদ্যার বেসিক শিখতে লাগল। কয়েক মাসের মধ্যেই সে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে গেল।
---
বছর দুয়েক পর রাকিব শুধু একজন কর্মচারী নয়, অফিসের প্রধান ম্যানেজার হয়ে উঠল। তার পরিশ্রম, সততা আর ধৈর্য তাকে সবার কাছে সম্মানিত করল। আরিফ সাহেব একদিন তাকে ডেকে বললেন,
— "আমি চাই তুমি এই কোম্পানির অংশীদার হও। তোমার মতো মানুষই এই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।"
রাকিব অবাক হয়ে গেল। যে ছেলে একদিন স্টেশনে রাত কাটিয়েছিল, সে আজ একটি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার!
সময়ের সাথে সাথে কোম্পানি বড় হতে লাগল। রাকিব নিজের বেতন আর লাভের টাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে নতুন ঘর বানাল। বাবার চিকিৎসা করাল, মায়ের জন্য সেলাই মেশিন কিনে দিল। শুধু তাই নয়, সে তার গ্রামে একটি ছোট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলল, যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা বিনামূল্যে কম্পিউটার ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ পায়।
গ্রামের মানুষ এখন তাকে সম্মান করে "রাকিব সাহেব" বলে ডাকে। কিন্তু রাকিব কখনো ভুলে যায় না তার সেই দিনগুলোর কথা—রেলস্টেশনের রাত, ক্ষুধার যন্ত্রণা, হতাশার মুহূর্ত।
একদিন সে সেই পার্কের বেঞ্চে আবার বসে ছিল, যেখানে একসময় হতাশ হয়ে বসেছিল। এবার তার মুখে আত্মবিশ্বাসের হাসি। সে মনে মনে বলল,
"সাফল্য একদিনে আসে না। কষ্ট, ধৈর্য আর সুযোগ—এই তিনটি একসাথে হলে তবেই স্বপ্ন সত্যি হয়।"
---
গল্পের শিক্ষা একটাই—
অভাব তোমাকে থামাতে পারে না, যদি তোমার ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় হয়। হাল না ছাড়লে, একদিন না একদিন, কারও না কারও হাত তোমার দিকে বাড়বেই। আর সেই হাত ধরে এগিয়ে যেতে পারলেই জীবন বদলে যায়।
সমাপ্ত।🥀
